শুক্রবার, ১৭ মে ২০১৯, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন

ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ (সা.)

ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ (সা.)

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনঃ
বারই রবিউল আউয়ালে প্রিয় নবীর আগমন
যেই নবীজীর শুভাগমনে ধন্য হলো ত্রিভুবন।
বস্তুত যেই মহামানবের শুভাগমনে সত্যিকার অর্থে এই ধুলির ধরা ধন্য হয়েছে তিনি হলেন ত্রিভুবনের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)। বিশ্ব-ইতিহাসের এক প্রতিশ্রুত মহামানব তিনি, যাঁর শুভাগমনের প্রতীক্ষায় ছিলো গোটা বিশ্বলোক। জন্মের বহু পূর্ব থেকেই সমগ্র জ্ঞান-জগত তাঁরই মর্ত্যলোকে প্রেরিত হওয়ার ভবিষ্যত-বাণী করে রেখেছিলো। পবিত্র কুরআনে এসেছে— ‘ওয়া মুবাশশিরাম বিরাসুলিন ইয়াতি মিমবাদি ইসমুহু আহমাদ’ অর্থাৎ হজরত মারইয়াম তনয় ঈসা (আ.) বলেন, আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসুল আসবেন আমি হচ্ছি তাঁর সুসংবাদদাতা (৬১:৬)। এভাবে তদানিন্তন দুনিয়ায় সকল ধর্ম-দর্শনে, আকিদা-বিশ্বাসে আর ধর্মীয় গ্রন্থাবলিতে সেই মহাপুরুষের আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়েছে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন— ‘আর নিশ্চয়ই তিনি মোহাম্মদ (সা.); যাঁর বর্ণনা পূর্ববর্তীদের গ্রন্থসমূহে রয়েছে (২৬:১৯৬)। ইহুদিদের তাওরাত, খ্রিস্টানদের বাইবেল, বৌদ্ধদের ত্রিপিটক, হিন্দুদের বেদ-পুরাণ ও পারসিকদের জিন্দাবেস্তায় প্রতিশ্রুত বিশ্বমানব মোহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। আর তিনি নিজে স্বীয় সত্ত্বা সম্বন্ধে বলেছেন— ‘আমি পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া (২:১২৮), পয়গম্বর ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদ (৬১:৬) এবং আমার মা আমেনার স্বপ্নের ফসল।’ রাসুল-জননী আমেনার স্বপ্নটি এমন ছিলো যে, একটি আলোক-প্রভা তাঁর শরীর থেকে নির্গত হয়ে শ্যাম দেশের প্রাসাদগুলোকে উদ্ভাসিত করে দিচ্ছে; সেই আলোকের নামই মোহাম্মদ (সা.)। মায়ের এই স্বপ্নটি ছিলো তাঁর কীর্তিময় সন্তানের শুভাগমনের পূর্বাভাস; সময়ের ব্যবধানে যিনি হলেন এই মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব।
মানুষ মানুষের কাছে বা গোটা সৃষ্টিলোকের প্রিয়পাত্র হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক। নৈতিক ও মানবিক সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের ধারক হলেই কেবল একজন মানুষ ত্রিভুবনের প্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। প্রথম বৈশিষ্ট্য হিসেবে মানবজীবনে যা অত্যাবশ্যক সেটি হলো আখলাক তথা উন্নত চরিত্র। সেদিক থেকে মহানবী (সা.) ছিলেন ব্যতিক্রমী, স্বতন্ত্র ও অনন্য; কেননা একজন পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিচ্ছবি তাঁর মাঝে প্রতিফলিত হয়েছিল। পৃথিবীর মানুষ তাঁর উন্নত চারিত্রিক মাধুর্য নিয়ে আর কী-ই বা বলবে; স্বয়ং মহান আল্লাহই তাঁর চরিত্রের সনদ দিয়েছেন। তিনি বলেন— ‘ওয়া ইন্নাকা লাআলা খুলুকিন আযিম’ অর্থাৎ হে রাসুল! আপনি সর্বোন্নত মহান চরিত্রের উপরে অধিষ্ঠিত রয়েছেন (৬৮:৪)। তাঁর জীবনের সকল দিক ও বিভাগ মানুষ ও মানবতার জন্যে শিক্ষণীয় ও আশির্বাদ হিসেবে পরিগণিত। নবী-জীবনের কোনো বিষয়ই লুকানো বা অপ্রকাশিত নেই; আদর্শ হিসেবে সকল কিছুই বলে দেয়া বা প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে। তাঁর নির্দেশনা ছিল— দিবসে বা রজনীতে আমার মাঝে তোমরা যা কিছুই প্রত্যক্ষ করবে, সবকিছুই মানুষের কাছে বর্ণনা করে দিবে। এমন কোনো কথা তিনি বলেননি যেটি নিজে পালন করতেন না বা এমন কোনো কাজ তিনি করেননি, যাতে মানুষের জন্য কল্যাণ ও আদর্শের বিষয় থাকতো না। তাঁর কথা, কাজ ও সম্মতি সবই ছিল মানুষের জন্য অনুকরণীয়। আর সে কারণেই পৃথিবীর স্রষ্টার অমোঘ ঘোষণা— ‘ওয়ামা আতাকুমুর রাসুলু ফাখুযুহু ওয়ামা নাহাকুম আনহু ফান্তাহু’ অর্থাৎ তোমাদের রাসুল যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা তোমরা পালন করো আর যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন তা থেকে নিজেদের বিরত রাখো (৫৯:৭) কেবলমাত্র আদর্শিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তায় যিনি সর্বোন্নত মর্যাদায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, তাঁরই সকল আদেশ-নিষেধ বিনা বাক্য-ব্যয়ে মেনে নেয়া যায়; সেক্ষেত্রে মহানবী (সা.) অতুলনীয়।
মানবসমাজে মানুষের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন ও সমাদৃত হওয়ার আরেকটি প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো জ্ঞান ও প্রজ্ঞা; যার মাধ্যমে মানুষ অন্যদের উপরে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তারে সক্ষমতা লাভ করে। মহানবী (সা.) বলেছেন— ‘আনা মাদিনাতুল এল্ম’ অর্থাৎ আমি হচ্ছি জ্ঞানের রাজ্য। অন্য একটি ঘোষণায় তিনি বলেন— ‘ইন্নামা বুইসতু মোআল্লিমান’ অর্থাৎ নিশ্চিতরূপে আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। বিস্ময়কর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন মহানবী (সা.); যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মহান আল্লাহ শুধুমাত্র তাঁকেই বিশেষভাবে প্রদান করেছিলেন। আনুষ্ঠানিক জ্ঞানার্জন না করেও তিনি সর্বাপেক্ষা অধিক জ্ঞানী, এখানেই তাঁর বিশেষ মাহাত্ম্য ও স্বাতন্ত্র। মহান আল্লাহ বলেন— ‘ওয়াকুর রাব্বি যিদনি ইলমা’ অর্থাৎ বলো, হে প্রভু! আমার জ্ঞানকে বৃদ্ধি করে দাও (২০:১১৪)। মহানবী (সা.) সরাসরি মহান আল্লাহর কাছ থেকে জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছেন এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অনেক অজানা শাখায়ও তাঁর বিচরণ ছিলো; যার মাধ্যমে তিনি নিজের জ্ঞান-জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহপাক বলেন— ‘ওয়া আল্লামাকা মা লাম তাকুন তাঅলাম’ অর্থাৎ মহান আল্লাহ তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন এমন জ্ঞান, যা তুমি জানতে না (৪:১১৩)। পরম করুণাময় প্রভু মহানবীকে (সা.) সমস্ত জ্ঞান মুখস্থ করিয়ে দিতেন, তা তিনি বক্ষে ধারণ করতেন এবং পাঠের সক্ষমতা লাভ করতেন। বিবৃত জ্ঞানের কোনো কিছু তাঁর কাছে দুর্বোধ্য মনে হলে মহান আল্লাহই তা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতেন (৭৫:১৭)। পবিত্র কুরআনে সকল জ্ঞানের মওজুদ রয়েছে— ‘মা ফার্রাতনা ফিল কিতাবি মিন শাইয়িন’ অর্থাৎ জ্ঞানের কোনো বিষয়ই কুরআনে লিখতে আমি ছাড়িনি (৬:৩৮)। আর সেই কুরআনী জ্ঞানের ধারক হলেন মহানবী (সা.); তাই জ্ঞান-প্রজ্ঞার কোনো অংশই তাঁর কাছে অনুপস্থিত ছিল না।
মানবসমাজে প্রিয়পাত্র হবার জন্যে মানুষের সৌন্দর্য এক নিয়ামক শক্তি। মহানবী (সা.) সেখানেও শতভাগ উত্তীর্ণ ছিলেন। দৈহিক সৌন্দর্যের দিক থেকে তিনি ছিলেন সবার সেরা; তাঁর মতো সুন্দর দেখতে কখনো কেউ ছিলো না আর হবেও না। মহানবী (সা.) বলতেন— ‘আল্লাহু জামিলুন য়ুহিব্বুল জামাল’ অর্থাৎ আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। আর রাসুল (সা.) হলেন সৌন্দর্যের সম্রাট; সেজন্য তিনি হলেন ‘হাবিবুল্লাহ’ তথা আল্লাহর সর্বাপেক্ষা প্রিয় বন্ধু এবং সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। নবীপত্নী হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন— ‘যে সকল সুন্দরী হজরত ইউসুফ (আ.)-কে দেখে নিজেদের অজান্তে তাদের হাত কেটে ফেলেছিল, তারা যদি মহানবী (সা.)-কে দেখতে পেত, তবে কখন যে হাত কাটতে কাটতে নিজেদের অজান্তে তারা তাদের কলিজাও কেটে ফেলে দিত— তা মোটেই টের পেতো না।’ লালিমা মিশ্রিত উজ্জ্বল বর্ণের ছিলেন মহানবী (সা.)।পূর্ণিমা রাতের মতো ঝলমল করতে দেখা যেত তাঁর চেহারা মোবারক, কোঁকড়ানো মসৃণ চুল, উন্নত ললাট, প্রশস্ত বক্ষ, খাড়া নাসিকা, সরু ভ্রু, বিস্তৃত মুখমণ্ডল, সম্মোহনী দৃষ্টিদ্বয়, যাদুময়ী চাহনী, দৃষ্টিনন্দন কাঁধ, বৃহদাকার মাথা, প্রশস্ত তালু ও বাহু বিশিষ্ট হস্তদ্বয়, সমান উচ্চতার বুক-পেট, মুক্তার দানার মতো ঝলমলে দাঁত, মেদহীন শরীর, মাংসল ও লম্বা আঙ্গুল, মসৃণ কদমযুগল, উন্নত গর্দান আর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব-প্রভার আলোকে উদ্ভাসিত সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ছিলেন মহানবী (সা.); যে কেউই তাঁর সামনে যেত, বিস্মিত হতো তাঁকে দেখে, যতবার দেখতো মনে হতো এই প্রথমবার দেখেছে। তাঁর মাঝে বিরাজিত ভাব-গাম্ভীর্য আর অপার সৌন্দর্য দেখে সকলেই বলতো, এমন সুন্দর মানুষ আর কখনো দেখিনি। তাইতো মহানবী (সা.) হলেন ত্রিভুবনের সকলের প্রিয়, সবচেয়ে প্রিয়।
তিন ভুবনের সমাহারকে ত্রিভুবন বলা হয়ে থাকে। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল-এর সমন্বয়ে যে রূপ তাকেই অনেকে ত্রিভুবন অভিহিত করে থাকেন। কিন্তু জাতীয় কবি নজরুলের ভাষায় এখানে মূলত ইহজগত ও পরজগতকেই বুঝানো হয়েছে। অন্য কথায়, এখানে ত্রিভুবন বলতে সমগ্র বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের সাথে সাথে গোটা সৃষ্টিজগত তথা মহাবিশ্বকেই তুলে ধরা হয়েছে; যার সর্বকালের সবচেয়ে প্রিয়পাত্র হলেন বিশ্বনবি মোহাম্মদ (সা.)। সমগ্র মহাবিশ্বের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও প্রিয় সেই মহামানবের ধরাপৃষ্ঠে শুভাগমণের ফলশ্রুতিতে তাই কবি আকাশ, সাগর, বাতাস তথা কুল মাখলুককে আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরই দর্শনে নিজেদের ধন্য ও আপ্লুত করতে। কবির ভাষায়—
ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়।
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখ্বি যদি আয়।।
ধূলির ধরা বেহেশতে আজ, জয় করিল দিল রে লাজ।
আজকে খুশির ঢল নেমেছে ধূসর সাহারায়।।
দেখ্ আমিনা মায়ের কোলে, দোলে শিশু ইসলাম দোলে।
কচি মুখে শাহাদাতের বাণী সে শোনায়।।
আজকে যত পাপী ও তাপী, সব গুনাহের পেল মাফী।
দুনিয়া হতে বে-ইনসাফী জুলুম নিল বিদায়।।
নিখিল দরুদ পড়ে লয়ে নাম, সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।
জীন পরী ফেরেশ্তা সালাম জানায় নবীর পায়।।
[প্রবন্ধটি সীরাতে রাসুল (সা.)-এর উপর রচিত জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ হিসেবে নির্বাচিত]

লেখকঃ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন, লেখক ও গবেষক; শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com