শনিবার, ১৮ মে ২০১৯, ০৩:০৫ অপরাহ্ন

বাজিতপুরের সরারচর বাজারে অগ্নিকান্ডে ৫টি দোকান পুড়ে ছাই, দোকান মালিকেরা নিঃস্ব

বাজিতপুরের সরারচর বাজারে অগ্নিকান্ডে ৫টি দোকান পুড়ে ছাই, দোকান মালিকেরা নিঃস্ব

 

মোহাম্মদ মাকসুদুল হাসান ভূঁইয়া রাহুলঃ
আগুনের লেলিহান শিখার উত্তাপে শাহেদ আলীর বাসা ও দোকানের চাল পুড়ে খোলা আকাশ উঁকি দিয়েছে। নিজের থাকার জায়গা আর আয়ের একমাত্র উৎস হারিয়ে নিঃস্ব শাহেদ আলীর আছে শুধুই চোখের জল আর বুক ভারী নিঃশ্বাস!

জুনায়েদ নামের এক ছেলে আছে শাহেদ আলীর। ১১ বছরের জুনায়েদ ক্যান্সারে আক্রান্ত। ছেলেটার চিকিৎসায় ইতোমধ্যেই ৭-৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে শাহেদ আলীর। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে আরো বছর দুয়েক বলে জানান তিনি। এদিকে দোকানের জন্য আনা নানান মালামালের ৩-৪ লাখ টাকাও তাঁর কাছ থেকে পাবেন ব্যবসায়ীরা। তাঁর দোকানের লভ্যাংশের টাকা থেকে এই পাওনা পরিশোধ করবেন বলে ভেবে রেখেছিলেন শাহেদ আলী।

ছেলের চিকিৎসা, পরিবার চালানোর চিন্তা, লক্ষাধিক টাকার ঋণের বোঝা আর একমাত্র জীবিকার উৎস হারিয়ে দু’চোখে রাজ্যের অন্ধকার দেখছেন আগুনের বিভীষিকায় দোকান হারানো শাহেদ আলী। দোকানের পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্রের কালো ছাইয়ের উপর তাঁর চোখ বেয়ে পড়া অসহায় অশ্রুরা তারই সাক্ষ্য দিচ্ছিলো।

শুধু শাহেদ আলীই নয়, আগুনের ভয়াবহ থাবায় দোকান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন আরো ৪ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক।

শুক্রবার(২১ ডিসেম্বর,২০১৮) দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১১ টায় কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার সরারচর বাজারের সিএনবি রোডের ৫টি দোকান আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। এতে কোটি টাকার উপরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দোকানগুলোর মালিকেরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফারুক মিয়ার মটর সাইকেল পার্টসের দোকান, শাহী সাইকেল স্টোর, ভূঁইয়া মটরস, মোল্লা সাইকেল স্টোর ও জনি মটরস নামের ৫ টি দোকানের সব জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এসময় জনি মোটরসে রাখা পালসার, হিরো হোন্ডা, প্লাটিনা, ওয়ালটনসহ বিভিন্ন ব্র‍্যান্ডের ১৫ টি মোটরসাইকেল সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন দোকান মালিক নূর ইসলাম। আগুনের ভয়াবহতা এতটাই প্রখর ছিল যে পার্শ্ববর্তী কলাবাগানের গাছগুলো পর্যন্ত পুড়ে গেছে, এমনকি দোকানগুলোতে রাখা লোহার তৈরি নানান যন্ত্রাংশও গলে বাঁকা হয়ে গেছে।

শাহেদ আলীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সংলগ্নই ছিল তাঁর বাসা। সেখানে তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

শাহেদ আলী বলেন, আমার দোকানের সাথেই আমার বাসা। আমি ও আমার পরিবারের সবাই রাতে বাসাতেই ছিলাম। হঠাৎই রুমের ভেতরে ধোঁয়ার অস্তিত্ব টের পাই। তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বের হয়ে আসি। বাইরে এসে দেখি আমার ও পার্শ্ববর্তী দোকানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।

তিনি জানান, মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পার্শ্ববর্তী আরো তিনটি দোকানে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেগুলোও সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

খবর পেয়ে বাজিতপুর, কটিয়াদী ও কুলিয়ারচর থেকে ফায়ার সার্ভিসের ৩ টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ২-৩ ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। বাজারে এই ৫ টি দোকান ছাড়াও আরো অনেক দোকান রয়েছে। কয়েকটা দোকানে গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করা হয়। যথাসময়ে ফায়ার সার্ভিস উপস্থিত হয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারায় বাজারের অন্যান্য দোকানগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারেনি বলে জানান বাজারের ব্যবসায়ীরা। তানাহলে গ্যাসের সিলিন্ডারের দোকানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশংকা ছিল বলে জানান তাঁরা।

তবে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে তা সম্পর্কে নিশ্চিত নন কেউ। ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর সবকটিই মোটর সাইকেল, সাইকেল, ট্রাক ও অন্যান্য গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রয় ও মেরামত করা হতো বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পুড়ে যাওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোই তাঁদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ছিল। এত বড় ক্ষতি সামলে উঠার মতন একক ক্ষমতা তাদের নেই। তাঁরা প্রশাসনের সহায়তা কামনা করেছেন।

কান্না জড়িত কণ্ঠে মোল্লা সাইকেল স্টোরের মালিক বোরহান উদ্দিন বলেন, আমার সারাজীবনের সঞ্চয় আমি এই দোকানে লাগিয়েছি। আমার আয়ের একমাত্র উৎস এই দোকান। দোকানটা পুড়ে গিয়ে আমি একদম পথে বসে গেলাম।

তিনি আরো বলেন, এখানে যেসব দোকান আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেসব দোকানের মালিকেরা সবাই দীর্ঘদিন এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমাদের যদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা অথবা বিনা সুদে বা স্বল্প সুদে আর্থিক ঋণের ব্যবস্থা করা হয় তবে আমরা আমাদের ক্ষতিটা পুষিয়ে পুনরায় ব্যবসা দাঁড় করাতে পারবো।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া বাকি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকগণের সঙ্গেও কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাঁদের সবারই আয়ের একমাত্র উৎস ছিল পুড়ে যাওয়া দোকানগুলো। দোকান পুড়ে যাওয়াতে তাঁরা একেবারেই নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা। এই মুহূর্তে আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো পথ নেই। তাঁরাও অনুরোধ জানিয়েছেন যেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য কিছু আর্থিক অনুদান বা বিনা সুদে কিংবা নামমাত্র সুদে আর্থিক ঋণের ব্যবস্থা করা হয়।

আগুনের ভয়াবহতার কিছু স্থিরচিত্রঃ  

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com