বুধবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:০২ অপরাহ্ন

অল্প খরচে বাইকে টাঙ্গুয়ার হাওর ট্যুর

অল্প খরচে বাইকে টাঙ্গুয়ার হাওর ট্যুর

সাইদুল ইসলাম : ঈদের আগেই আমাদের প্লান ছিলো গতবারের টেকনাফ ট্যুরের মতো একটা লং ট্যুর দিবো। তাই “ছুট”র চ্যাট রুমে এই বিষয়ে সবার মতামত চাইলাম। আমার ইচ্ছা ছিলো বাইক নিয়ে সুনামগঞ্জের তাহেরপুর উপজেলার হাওড় অঞ্চল দেখবো। অন্যদের মতামত ছিলো পাহাড় আর ঝিরিপথের রাজ্য বান্দরবনের থানছির নাফাকুম জলপ্রপাত। তাই নিজের ইচ্ছেকে গলাটিপিয়ে নাফাকুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম অন্য একটি ট্যুর গ্রুপের সাথে এড হয়ে।কিন্তু ঈদের দুইদিন আগে হুট করেই ট্যুরটি কেন্সাল হয়ে যায় ভুল বুঝাবুঝির কারণে। তাই সবার মন খারাপ হয়ে গেলো, আমারও কিছুটা। তাতে কি? সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম বাইক নিয়ে ঈদের পরের দিন সুনামগঞ্জ যাবো।
ঈদ এবং পরের দিনটি পরিবারের সাথে কাটিয়ে ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে বিকেল সাড়ে ৬টার মধ্যে একে একে সবাই বিশ্বরোড চলে আসি।কয়েকটা গ্রুপ ছবি তুলে ৫টি বাইক নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি। একঘণ্টায় ৫৯ কি.মি পথ পিছনে ফেলে নরসিংদীর ইটা খোলা থেকে রাজন আর তার বন্ধু সামছুকে সাথে নিয়ে মরজাল এসে সোহেল মামার অনুরোধে চা এর বিরতি। সোহেল মামা নরসিংদীর লোকাল, পেশায় ঢাকার ব্যবসায়ী।
গ্রুপের সকলের সাথে পরিচয় না করিয়েই যাত্রা করাটা ঠিক হচ্ছেনা। সুজুকি জিক্সার নিয়ে আমাদের সাথে আছে মিজু, জাহিদ, রুবেল,নাদিম। ফেজার নিয়ে আছে জাহিদুল, সোহেল, রাজন আর সামছুল এবং পালসার নিয়ে আছে ইব্রাহিম, রাজু,সোহেল আর আমি (সাইদুল)।
চা পর্ব শেষ করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুট। ১৫ কি.মি বাইক চালানোর পরে ভৈরব এসে সবাই চাকার হাওয়া চেক করে নিলাম।
সেইসাথে ভৈরব যাত্রী স্টপেজের পাশের হোটেলে বসে রাজু ভাইয়ের বাসা থেকে বক্সে করে নিয়া আসা কোরবানির গরুর গোস্ত ও সবজি দিয়ে গরম গরম পরাটায় পেটের চাহিদা মিটিয়ে নিলাম।


টোল পরিশোধ করে ভৈরব ব্রিজের উপরে দেখা পরিচিত একটি গ্রুপের এডমিন রাজ ভাই-ভাবি এবং তাদের সদস্যদের সাথে। তাদের গন্তব্যও হাওড়ের অঞ্চল কিন্তু তারা যাবে সকালের দিকে। কিছু সময় তাদের সাথে ছবি আর আড্ডা দিয়ে পথচলা। সাহজী বাজার রাস্তার পাশেই একটি টং দোকানে দশ মিনিটের চা এর ব্রেকটা ছিল অস্থির। আড্ডার পাট চুকিয়ে আমরা যখন সায়েস্তা গঞ্জ নতুন ব্রিজের কাছা কাছি তখনি দেখা দিলো বিপত্তি। ইব্রাহিমের বাইকের সামনের চাকার হাওয়া উদাও। তখনি মনে পড়ে গেলো টং দোকানের এক নাম না জানা বয়স্ক ব্যক্তির কথা। তিনি আমাদের সাবধানে বাইক চালানোসহ রাস্তার বড় বড় গর্তের কথা আগেই বলে সতর্ক করে ছিলো। কিন্তু আমরা তার কথা না মেনেই ৭০/৮০ কি.মি গতিতে বাইক চালাচ্ছিলাম। তাই অল্প দূর আগাতেই দূর্ভোগ, রাত তখন ঘুমিয়ে । আধা কিলোমিটার বাইক ঠেলে মেসার্স চৌধুরী ফিলিং স্টেশনে এসে সুমন ভাইয়ের চাক্কার দোকানে ভরসার দেখা মিলে।পঞ্চাশ টাকা আর পান খাইয়ে এই যাত্রায় আমাদের রক্ষা।এখানেও ছোট খাটো একটা কফির আড্ডা হয়ে গেলো। আধা ঘণ্টা বাইক চালানোর পর নবীগঞ্জে এসে পাই বৃষ্টির দেখা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে মিনিট দশেক বাইক চালিয়ে আমরা থেমে যাই সড়কের পাশে চা স্টলে। আবার আড্ডা । ঘণ্টা দুয়েক বৃষ্টিতে বাইক চালিয়ে আমরা যখন গোবিন্দগঞ্জ তখন খুদার হেস্কা টানে ডুকে পড়ি সোনারবাংলা হোটেলে। ডিম বাজা দিয়া খিচুড়ি, ডাইল ভুনা আর সাদা মিষ্টি তখন মনে হচ্ছিলো বাংলার সেরা খাবার।১২ জনে খেয়ে বিল করেছি ৯৪০ টাকা তারমধ্যে ম্যানেজার নয়ন মিয়া ২৬ টাকা কম নিয়েছে। সোনার বাংলার চা কিন্তু অসাধারণ।খাবার পর্ব শেষ করেই অন্ধকার পথে বাইকের আলোতে চলা। কিছু দূর এগুতেই হাওড় এলাকার সুন্দরী বৃষ্টি আপুর সাথে দেখা। ভোরের আকাশ বেধ করে ছুটে আসা একেকটা ফোঁটা মনে হচ্ছে পাথরে বালুর কণা। ভিজতে ভিজতে যখন ক্লান্ত তখনই চোখে পড়ে সুনামগঞ্জে আপনাকে স্বাগতম। তখনও ধুম বৃষ্টি।উপরে ফিটফাট দেখে দলবেঁধে ডুকে যাই আবাসিক হোটেল নুরানিতে। রুম যেমন তেমন ভাড়া কিন্তু মনের মতন।তিন রুমের ডাবল বেট ২৪ ঘণ্টায় দুই হাজার। হুমড়ি খেয়ে সবাই যখন গোসল সেরে ঘুমাতে ব্যস্ত তখনি শুরু ছারপোকার আক্রমণ! শরীরের ক্লান্তিতা সব কিছুকেই তুচ্ছ মনে করে হারিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে।ঘুম থেকে উঠে চলে যাই সুরমা নদীর ঘাটে সিলেটী রেস্টুরেন্টে। হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত আহ কি ঝাল!
সাথে ১০ পদের মসলা দিয়ে পান। বুড়ো দাদার মতো পান ঠেলে দিয়ে মুখে বিসম্ভরপুরের আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে চলে আসি যাদু কাটা নদীর কাছে। আদি আমলের ইঞ্জিন চালিত নৌকায় ভাবে পার হয়ে পৌঁছে যাই বারেক্কাটিলায়। টিলাতে উঠার আগেই ভুট দিয়ে ডিম খিচুড়ি কিন্তু জোস। বারেক্কে টিলার অলিগলি ঘুরে আমরা চলে যাই চানপুড় টিলা ঝর্না তে। সেখানে কিছু সময় ঝর্নার পানিতে পা ভিজিয়ে চলে যাই নিলাদ্রি লেকে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পাহাড় ঘেসা লেক আর উপনিবেশিক যুগের নানা সৌন্দর্য দেখে বালু-নদী পাড় হয়ে চলে আসি রাত্রি যাপনের জন্য ছাড় পোকার রাজ্যে।
মশার সাথে যুদ্ধ করে ঘুমিয়ে পরি অচেনা শহরের হোটেল রুমে। সকালের নাস্তা আর হোটেলের পাট চুকিয়ে সঙ্গে থাকা ব্যাগ গুছিয়ে ছুটে যাই তাহেরপুরের নয়কুডি কান্দা ছয় কুড়ি বিলের সৌন্দর্য দেখতে। ঘণ্টা খানেক হাওড়ের পথে বাইক চালিয়ে চলে যাই বাটি তাহেরপুর গ্রামে। এই গ্রামটির কিছুদূর গেলেই দেখা মিলে বর্ষায় হাওড়ের নিচে হারিয়ে যাওয়া পথের শুরু।গ্রামের চা দোকানের আড্ডায় পরিচয় ষাটোর্ধ আহাম্মদ আলীর সাথে। তিনি জানান এখানে তিনটা হাওড় রয়েছে তার মধ্যে সনি হাওড় আকারে বড়, এর পরে রয়েছে মাইটাইন হাওড়। এর মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওড় হচ্ছে একটি বিল, নয়কুডি কান্দা( পতিত সম্পত্তি) ছয় কুড়ি বিল (১২০ টা বিল) নিয়া এটার নাম করন। শীতের সময় নদী আর বিল ছাড়া সবখানে ফসল করা হয়। নদীতে তখনও কার্গো জাহাজ চলাচল করে। বাটি তাহেরপুর গ্রামের সড়ক দিয়ে শীতের সময় ছোট পরিবহনে নেত্রকোনাসহ হাওড়ের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়। গ্রাম থেকে অল্প টাকায় টলার ভাড়া আর স্থানীয় বাজার থেকে দুপুরের খাবারের জন্য রাঁজহাস,চাউল,তেল,মরিচ কিনে মাঝির ঘরে রাঁধতে দিয়ে চলে যাই হাওড়ে।


স্বচ্ছ পানি আর শৈবালের মাঝে মাছের দৌড়া দৌড়ী দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই ওয়াচ টাওয়ারে। ঘণ্টা খানেক পানিতে ছুটা ছুটি করে পড়ন্ত বিকালে ফিরে আসি ভাটি তাহেরপুর গ্রামে।দুপুরের খাবার সন্ধ্যায় খেয়ে অতিরিক্ত ঝালে কান লাল করে যাত্রা শুরু করি ঢাকার পথে। গতি নয় সুস্থ ভাবে পরিবারের কাছে ফেরাই ছিলো মূল লক্ষ। তাই রাতের নীরবতাকে আপন করে বৃষ্টির সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে মধ্যে রাতে পৌঁছে যাই ভৈরব শহরে।এর পর আর বৃষ্টির দেখা না পেলেও পেয়ে যাই বাড়ির দেখা। আপনি চাইলেই দুই হাজার টাকা পকেটে নিয়ে ১০/১২ জনের একটি গ্রুপ করে ঘরে আসতে পারেন হাওড়ে।

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com