শনিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৯, ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন

ভারতে শিশু আসিফা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় তিনজনের যাবজ্জীবন

ভারতে শিশু আসিফা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় তিনজনের যাবজ্জীবন

অর্থের অভাবে আট বছরের মেয়ে আসিফার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় শুনতে যেতে পারেনি তার পরিবার। মামলার রায় যখন বের হয়, তখন কাশ্মীরের কাঠুয়া উপত্যকায় ভেড়া ও ছাগল চরাচ্ছিল আসিফার পরিবার। তারা জানেও না যে ওই দিন মামলার রায় দেওয়া হয়েছে।

শেষমেশ আসিফার মা যখন জানতে পারেন তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ছয়জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে, কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি জানান, মামলার রায় শুনতে পাঞ্জাবের পাঠানকোট শহরে যাওয়ার মতো অর্থসংস্থান তাঁদের নেই। কিন্তু রায় শুনে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানান তিনি।

গতকাল সোমবার ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের পাঠানকোট শহরে বিচারক তেজবিন্দর সিংয়ের আদালত কাশ্মীরের কাঠুয়া উপত্যকায় আট বছরের শিশু আসিফা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ওই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া আলামত ধ্বংস করায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত।

গত বছরের ১০ জানুয়ারি কাঠুয়ায় আট বছরের শিশু আসিফাকে অপহরণ ও গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। অপহরণের তিন দিন পর শিশুটিকে হত্যা করা হয়। ১৭ জানুয়ারি একটি জঙ্গলের ভেতর থেকে ওই শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, দেবীস্থান মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণকারী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সানজি রাম (৬০) চার পুলিশ কর্মকর্তা সুরিন্দার ভার্মা, আনন্দ দত্ত, তিলক রাজ ও দীপক খাজুরিয়ার সহযোগিতায় ওই অপরাধের পরিকল্পনা করেন। সে সময় রামের ছেলে বিশাল, ভাগ্নে ও তাঁর বন্ধু পারবেশ কুমারকেও ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত করা হয়।

অভিযুক্ত আটজনের মধ্যে রাম, তাঁর বন্ধু পারবেশ কুমার ও পুলিশ সদস্য খাজুরিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাকি তিন পুলিশ সদস্য সুরিন্দার, আনন্দ ও তিলককে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাকি দুই আসামির মধ্যে রামের ছেলে বিশালকে বেকসুর খালাস ও বয়স নিয়ে বিতর্ক থাকায় তাঁর ভাগ্নেকে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিচারের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

রায়ের পর মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী বিবিসিকে জানান, ‘এ রায় ভারতের সাংবিধানিক ক্ষমতার বিজয়, ধর্মীয় ভেদাভেদের বাইরে এসে সারা দেশ এ মামলার পক্ষে লড়েছে।’

যদিও রায়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে আসিফার পরিবার জানিয়েছে, মামলার প্রধান দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া না হলে তাঁরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন।

গত বছর আসিফা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ঘটনায় সারা ভারত উত্তাল হয়ে উঠলে দেশটিতে ১২ বছরের নিচে কোনো শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার একটি নতুন আইন পাস করা হয়। যদিও এ রকম ক্ষেত্রে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা বিচারকের হাতে রাখা হয়েছে।

২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি কাঠুয়া এলাকায় ঘোড়া চরানোর সময় ওই শিশু আসিফাকে অপহরণের পর স্থানীয় মন্দিরে নিয়ে ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। শিশুটিকে অপহরণের জন্য দেবীস্থান মন্দিরের পুরোহিত সানজি রাম তাঁর ভাগ্নে ও এক পুলিশ সদস্যকে নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশ বাস্তবায়নের পর সাত দিন ধরে মন্দিরে আটকে রেখে আসিফাকে ধর্ষণ করা হয়। পরে মাথায় পাথর মেরে ও গলা টিপে হত্যা করা হয় শিশুটিকে।

পরে ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তদন্তে নামে ক্রাইম ব্রাঞ্চ। পাওয়া যায় আলামত লোপাটের অভিযোগ। ঘটনায় সানজি রামের ছেলে বিশাল, তাঁর বন্ধু ও একাধিক পুলিশ অফিসার জড়িত থাকার কথাও জানা যায়।

দেশব্যাপী প্রতিবাদ ও চাপের মুখে তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিশেষ আদালতে মামলার শুনানির নির্দেশ দেয়। যত দ্রুত সম্ভব মামলার নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেন তৎকালীন জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘ ১৭ মাস মামলার শুনানি শেষে গতকাল রায় ঘোষণা করেন আদালত। এ সময় আদালতের বাইরে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com