সোমবার, ১৫ Jul ২০১৯, ০৪:৩০ পূর্বাহ্ন

অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া পৃথিবীর দৃশ্যপট কেমন হবে?

অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া পৃথিবীর দৃশ্যপট কেমন হবে?

বিশ্ব জুড়ে কত কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে অ্যান্টিবায়োটিক, তার কোনো হিসাব নেই। আবিষ্কারের পর আজ ৮০ বছরের অধিক সময় পার করে মানুষের মনে নতুন চিন্তার সৃষ্টি হয়েছে। মরণঘাতী সব রোগ থেকে এতদিন যে অস্ত্র ব্যবহার করে রক্ষা পেয়েছে মানুষ, সে অস্ত্র দিনকে দিন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে! অস্ত্রের ধার কমার সাথে সাথে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অভিযোজন হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে অনেক দৃঢ়। একে একে ব্যাকটেরিয়াগুলো হয়ে উঠছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। যেসব জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিহত করতে শিখে গেছে, তাদের বলা হচ্ছে সুপারবাগ। এরকম সুপারবাগে আক্রান্ত হয়ে শুধুমাত্র আমেরিকাতেই প্রতি বছর আক্রান্ত হচ্ছে ২০ লক্ষাধিক মানুষ, যার মধ্যে ২৩ হাজার মৃত্যুবরণ করছে! আমেরিকার মতো একটি উন্নত দেশেই অবস্থা এত ভয়াবহ হলে অন্যান্য দেশের কী অবস্থা, তা ভাবতে গেলেই ভয়ে গা শিউরে ওঠে। গবেষকরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প খুঁজে পাওয়া না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটি মানুষ মারা যাবে সুপারবাগের আক্রমণে। কারণ, খুব সম্ভবত অ্যান্টিবায়োটিক পুরোপুরি অচল হয়ে যাবে শীঘ্রই।

আশার কথা হচ্ছে, মানবজাতির ভবিষ্যতের আকাশ যখন কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে, গবেষকরা তখন হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা অ্যান্টিবায়োটিকশূন্য পৃথিবীতে মানুষের জন্য বিকল্প অস্ত্র আবিষ্কারে নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন। ব্যাকটেরিয়া আক্রমণকারী ভাইরাস, ন্যানোপার্টিকেল কিংবা ব্যাকটেরিয়া প্রতিহত করতে পারা বিভিন্ন জীবদেহের অনাক্রম্য ব্যবস্থার দ্বারা উৎপন্ন প্রোটিন। এসব নিয়েই চলছে ভবিষ্যতে রোগ-জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি। অ্যান্টিবায়োটিক সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেলে কী দিয়ে রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়বে মানুষ, তা আলোচনার পূর্বে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া পৃথিবীতে কী কী সমস্যা হতে পারে, তা দেখে নেয়া যাক।

১. ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পারবে না মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, স্ট্রেপ থ্রোট, টিউবারকুলোসিস, লাইম ডিজিজ, কানে পচন কিংবা দেহত্বকে ঘায়ের মতো আরো অসংখ্য ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ আছে যেগুলো একসময় জীবনঘাতী ছিল। অ্যান্টিবায়োটিকের কল্যাণে এসব রোগ বর্তমানে সহজেই সেরে যাচ্ছে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক অচল হয়ে গেলে এগুলো আবারো হুমকি হয়ে উঠবে।

২. বিভিন্ন কসমেটিক বা সৌন্দর্যবর্ধনজনিত অপারেশন বন্ধ হয়ে যাবে। প্লাস্টিক সার্জারি, স্তন বর্ধন সহ বিভিন্ন কসমেটিক সার্জারির পর ত্বকে নানারকম ইনফেকশন হবার সম্ভাবনা থাকে। অ্যান্টিবায়োটিকই এখনো পর্যন্ত ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক না থাকলে কী হবে?

৩. ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে প্রচলিত তিনটি ধাপ হচ্ছে সার্জারি, রেডিয়েশন থেরাপি এবং কেমো থেরাপি। প্রতিটিই স্বতন্ত্র হলেও এক জায়গায় তারা একই বিন্দুতে মিলিত হয়। আর তা হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। ক্যান্সারের এই তিন প্রকারের চিকিৎসাতেই রয়েছে ভয়াবহ ইনফেকশনের ভয়, যেগুলোর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের সহায়তা নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। যখন অ্যান্টিবায়োটিক অচল হয়ে যাবে, তখন এক জীবনঘাতী রোগ ক্যান্সার থেকে মুক্তি পেতে ভয়াবহ ইনফেকশনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে রোগীদের।

৪. হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট, কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের মতো অপারেশনগুলো বিশ্ব জুড়ে লাখো মানুষকে দিচ্ছে নতুন জীবন। কিন্তু শঙ্কার ব্যাপার হলো এই যে, অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া পৃথিবীতে কোনো ধরনের ট্রান্সপ্লান্ট অপারেশন করা সম্ভব হবে না। কারণ, দেহের কোনো অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে সেটি প্রতিস্থাপিত করা হলে দেহের অনাক্রম্য ব্যবস্থা তা গ্রহণ করে না। তাই অনাক্রম্য ব্যবস্থার আক্রমণ হতে রক্ষা পেতে ট্রান্সপ্লান্ট অপারেশনের রোগীকে পরবর্তী জীবন পুরোটাই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে চলতে হবে। এর মানে দাঁড়ালো, অ্যান্টিবায়োটিক অচল হলে ট্রান্সপ্লান্ট অপারেশনও একেবারেই অচল।

৫. ছোটখাটো দুর্ঘটনাই জীবনের ইতি ঘটিয়ে দিতে পারে অ্যান্টিবায়োটিকবিহীন পৃথিবীতে। ছোটখাটো দুর্ঘটনা বলতে রিকশা বা সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে হাত-পা কেটে ফেলা, ব্লেড বা কোনো যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে হাত কাটা, খেলাধুলা করতে গিয়ে ত্বক ছিলে যাওয়া কিংবা কুকুর-বিড়ালের কামড়ের মতো ব্যাপারই হয়ে উঠবে প্রাণনাশকারী, যখন অ্যান্টিবায়োটিক অচল হবে। কারণ, এ ধরনের দুর্ঘটনায় প্রায়শই ইনফেকশন হবার ঝুঁকি থাকে, যা অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে প্রশমিত হয়। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক না থাকলে সামান্য ইনফেকশনই প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

৬. অ্যান্টিবায়োটিক না থাকলে কিংবা অচল হয়ে গেলে কী হতে পারে, তা নিয়ে চিন্তিত অর্থনীতিবিদগণও। এক গবেষণা বলছে, অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব জুড়ে বেকার হয়ে পড়বে ২৮ মিলিয়ন মানুষ। বৈশ্বিক জিডিপি প্রায় ৩.৪% পর্যন্ত হ্রাস পাবে। এটা কেবল প্রাথমিক ধাক্কা। দীর্ঘ মেয়াদে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া পৃথিবীতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাবে, কারণ অধিকসংখ্যক মানুষ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহণে ব্যস্ত থাকবে। ফলে অর্থনৈতিক মন্দা প্রকট থেকে প্রকটতর হতে থাকবে। পৃথিবীতে শুরু হবে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ!

এগুলো অ্যান্টিবায়োটিকবিহীন পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা। এগুলো ছাড়াও প্রতিদিনই নতুন নতুন সমস্যা উদ্ভূত হবে। এককথায়, অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া পৃথিবী কল্পনা করাই দুঃসাধ্য। তবে এই দুঃসাধ্য কাজটিই সহজ হয়ে যাবে যখন অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্পের কথা ভাবা হবে। কেমন হতে পারে সেসব বিকল্প? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

শত্রুকে নিরস্ত্র করে দেয়া

শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্ত্র চাই। যদি অস্ত্র না থাকে, তাহলে যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত। তবে বুদ্ধি করে যদি শত্রুকেও নিরস্ত্র করে দেওয়া যায়, তাহলে? অ্যান্টিবায়োটিক পরবর্তী পৃথিবীতে ব্যাকটেরিয়ার সাথে এরূপ নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াতেই যুদ্ধ করতে চান চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ। আর এজন্য তারা সাহায্য নিচ্ছেন ন্যানোটেকনোলজির। বিজ্ঞানীরা এক প্রকারের ন্যানো পার্টিকেল নিয়ে গবেষণা করছেন, যেগুলো দেহে প্রয়োগ করলে সেগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের মতো সরাসরি ব্যাকটেরিয়াকে হত্যা করবে না। তবে ব্যাকটেরিয়ার প্রধান অস্ত্রগুলো অকেজো করে দিতে সক্ষম হবে এবং তাতে করে আমাদের দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে।

ই. কোলি, অ্যানথ্রাক্সের ব্যাকটেরিয়া লিস্টেরিয়া কিংবা সাপ, বিছা বা সামুদ্রিক প্রাণীর বিষ সাধারণত দেহকোষে গর্ত সৃষ্টি করে এবং কোষের কার্যক্রমে বাধার সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে পুরো দেহে সমস্যার সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে ন্যানো পার্টিকেলগুলো স্পঞ্জের মতো কাজ করবে এবং বিষাক্ত রাসায়নিক শুষে নেবে। ফলে ব্যাকটেরিয়া এর কার্যকারিতা হারাবে অনেকাংশে। বর্তমানে ইঁদুরের দেহে এই ন্যানো পার্টিকেলের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। মানবদেহে সফলভাবে পরীক্ষা চালানো গেলে তবেই এটি বিশ্ব জুড়ে স্বীকৃত হবে। তবে এর কিছু সমস্যা রয়েছে। যেমন, এটি অ্যান্টিবায়োটিকের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল হবে, আক্রান্ত কোষে যথাযথভাবে পৌঁছুবে কিনা, তা নিয়েও থাকছে সন্দেহ।

হোম ডেলিভারি!

অ্যান্টিবায়োটিক অচল হয়ে যাবে বলতে সেগুলো কিন্তু তাদের কর্মক্ষমতা একেবারেই হারিয়ে ফেলবে না। কারণ দিনকে দিন অভিযোজিত হওয়া সুপারবাগেরও প্রতিরোধ ক্ষমতা সীমিত। সেই নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করতে পারলেই তখন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে। কিন্তু সে সীমা কীভাবে অতিক্রম করা যায়? অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের মাত্রা ৩/৪ গুণ বাড়িয়ে দিলেই কী তবে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?

প্রকৃতিতে অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যেগুলো অপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম। এ কাজে তারা ‘অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল পেপটাইড’ বা ‘এএমপি’ নামক একধরনের রাসায়নিক এজেন্ট ব্যবহার করে। তবে প্রাণিদেহের জন্য সেটি বিষাক্ত বলে সরাসরি ব্যবহার সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে গবেষণাগারে মানুষের তৈরী এএমপি হতে পারে সমাধান। অ্যামিনো অ্যাসিড আর নানা প্রকারের প্রোটিনের সমন্বয়ে তৈরী এই এএমপি কাজ করে ঠিক মিসাইলের মতো। এগুলো সরাসরি ব্যাকটেরিয়ার মেমব্রেনে আক্রমণ করে এবং গর্ত সৃষ্টি করে। ফলে ব্যাকটেরিয়া দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আর এই সুযোগে ওষুধ প্রয়োগ করলে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে, কাগজে-কলমে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে তেমন না-ও হতে পারে। অতিরিক্ত খরচ এবং যথাযথ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারার সক্ষমতা নিয়েই এখনো চলছে গবেষণা।

ব্যাকটেরিওফাজ

ব্যাকটেরিওফাজ হচ্ছে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম এক শ্রেণীর ভাইরাস। কিন্তু এগুলো আবার সরাসরি মানবদেহে প্রয়োগ করার উপযোগী নয়। সেক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিওফাজকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাহায্যে মোডিফাই করে মানবদেহে প্রয়োগ করার পরিকল্পনা করছেন। এই মোডিফাইড ব্যাকটেরিওফাজের কাজ হলো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে হত্যা করা। কোনো মানুষ যখন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়, তখন তার দেহে সবগুলো ব্যাকটেরিয়াই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয় না। বরং অনেক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াই প্রতিনিয়ত মরতে থাকে। কিন্তু এদের সংখ্যা কমে না, কারণ এরা এই প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। ব্যাকটেরিওফাজ যদি সফলভাবে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলতে পারে, তাহলে অন্য ব্যকটেরিয়াগুলো পুনরায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে উঠবে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা ফিরে আসবে।

এসব প্রস্তুতি চলছে মানে এই নয় যে বিজ্ঞানীরা এখনই অ্যান্টিবায়োটিকের উপর আশা ছেড়ে দিয়েছেন। বরং অ্যান্টিবায়োটিককে টিকিয়ে রাখতে কী করা যায়, তা নিয়েও চলছে গবেষণা। চলছে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উৎপন্ন করার প্রচেষ্টা। উপকারী ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস মানবদেহে প্রয়োগ করে জীবাণু হত্যা করা কিংবা প্রতিরোধী জীবাণুর দেহের বায়োফিল্ম নামক অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী আবরণ ধ্বংস করার বিকল্প রাস্তা উদঘাটনের জন্যও চলছে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সবমিলিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্টই চিন্তিত চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। সময়ই বলে দেবে অ্যান্টিবায়োটিক অচল হলে কী বিকল্প আসবে কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক আদৌ অচল হবে কিনা। সূত্র : Roar Media

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com