সোমবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন

বিচার বিভাগের জীবন্ত কিংবদন্তি শেখ হাফিজুর রহমানের যুগান্তকারী রায় : ইয়াবা ফেনসিডিল জব্দে তাৎক্ষণিক সাজা অবৈধ

বিচার বিভাগের জীবন্ত কিংবদন্তি শেখ হাফিজুর রহমানের যুগান্তকারী রায় : ইয়াবা ফেনসিডিল জব্দে তাৎক্ষণিক সাজা অবৈধ

মোবাইলকোর্টে শাস্তির আগে লাগবে রাসায়নিক পরীক্ষা

মোস্তফা কামাল,  : বিচার বিভাগের জীবন্ত কিংবদন্তি শেখ হাফিজুর রহমানের যুগান্তকারী রায়, ইয়াবা ফেনসিডিল জব্দে তাৎক্ষণিক সাজা অবৈধ এবং মোবাইলকোর্টে শাস্তির আগে রাসায়নিক পরীক্ষা লাগবে।
রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ইয়াবা বা ফেনসিডিল জব্দের মামলায় কোনো আসামিকে তাৎক্ষণিক সাজা প্রদান অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত। ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ (জেলা ও দায়রা জজ) শেখ হাফিজুর রহমান গত ১২ জুন এ রায় ঘোষণা করেন।

সাধারণত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকালে মাদক বিক্রেতা বা মাদকসেবীদের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে তাৎক্ষণিক সাজা দিয়ে থাকেন। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাদকসহ আসামি গ্র্রেপ্তার করে মোবাইল কোর্টে সোপর্দ করেন। উভয় ক্ষেত্রেই ‘মাদক’ উদ্ধার হলেও রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া সাজা দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন আদালত।

রায় প্রদানকারী মামলার ঘটনায় জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই র‌্যাব-২ মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনাকালে রাজধানীর জেনেভা ক্যাম্প থেকে উপস্থিত লোকজনের সামনে নাজমা বেগমের কাছ থেকে ৪৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় র‌্যাব কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা শামিম র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর অভিযোগ করেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুর রহমান আসামি নাজমা বেগমকে এক বছরের কারাদ- দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি আপিল করেন।

ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নাহিদ রসুল আপিলে আসামির সাজা বলবৎ রাখেন। নাজমা বেগম এ রায়ের বিরুদ্ধে মহানগর দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন। ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালত ওই আপিলের শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানি শেষে বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শেখ হাফিজুর রহমান গত ১২ জুন রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে বলা হয়, মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালীন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অপরাধ সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মোবাইল কোর্ট কর্তৃক সাজা দেওয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। আর সাজা দেওয়া হলে তা মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর ৬ (১) ধারার সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন। ধারাটি উল্লেখ করে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামি ফৌজদারি আপিল করলেও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তার রায়ে বিষয়টি আলোচনা করেননি। এ ছাড়া আসামিকে ইয়াবা উদ্ধারের অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০-এর ১৯ (১)-এর ৯ (ক) ধারায় শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

রায়ে আরও বলা হয়, এ আইনের তফসিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবার নাম নেই। ফলে আসামির কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ইয়াবা সরাসরি মাদক নয়। এটি সত্য যে, বাজারে প্রচলিত লালচে গোলাপি রঙের ট্যাবলেটের (যা ইয়াবা নামে পরিচিত) রাসায়নিক পরীক্ষা করলে কোনো কোনো ট্যাবলেটে মিথাইল অ্যামফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ মিথাইল অ্যামফিটামিন আইন অনুসারে মাদকের শ্রেণিভুক্ত। ট্যাবলেটের গায়ে মিথাইল অ্যামফিটামিনের অস্তিত্ব নির্ধারণকারী কোনো লেভেলও থাকে না। ফলে রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া ইয়াবা ট্যাবলেটকে মাদকদ্রব্য আইন ১৯৯০-এ উল্লিখিত মাদকসমূহে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো সুযোগ আইনে নেই। তাই রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া সাজা প্রদান অবৈধ।

একইভাবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফেনসিডিলও মাদক আইন অনুসারে সরাসরি কোনো মাদক নয়। ফেনসিডিলের মধ্যে ‘কোডিন’-এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই কোডিন আইন অনুসারে সরাসরি মাদক। ফলে ইয়াবার মতো ফেনসিডিল উদ্ধারের মামলাতেও রাসায়সিক পরীক্ষা না করেই রায় দেওয়া আইনানুগ নয়।

উল্লেখ্য যে, বিচারক শেখ পাফিজুর রহমান ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট থাকা কালে তিনি নিষ্ঠার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিচার প্রার্থি ও আইনজীবীদের কাছে হয়েছিলেন সমাদৃত। তাঁর আমলে সিএমএম আদালতে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মামলার নিষ্পত্তি করে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন যা বিচার বিভাগের জন্য বিরল দৃষ্টান্ত।

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com