সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন

রোহিঙ্গা তরুণীদের বিয়ের কথা বলে পাঠানো হচ্ছিল

রোহিঙ্গা তরুণীদের বিয়ের কথা বলে পাঠানো হচ্ছিল

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে বছর দুয়েক বন্ধ থাকলেও আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে সমুদ্রপথে মানবপাচার চক্র। তাদের মূল টার্গেট কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা তরুণী ও কিশোরী। মূলত মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা যুবকদের সঙ্গে তাদের বিয়ে দেওয়ার ফাঁদ পাতা হয়। কখনো কখনো দালালরা এমন যুবকদের সঙ্গে মোবাইলে কথাবার্তাও বলিয়ে দেয়। তখন সরল বিশ্বাসে পরিবারের সদস্যরাই তাদের হাতে তুলে দেয় নিজের মেয়েকে। এমনই এক রোহিঙ্গা তরুণীর নাম ইসমত আরা, যিনি গত মঙ্গলবার ডুবে যাওয়া ট্রলারের বেঁচে যাওয়া যাত্রী।

তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়াতে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা মিলে আমাকে হবু স্বামীর কাছে পাঠানোর জন্য ট্রলারে তুলে দিয়েছেন। যদিও আমাকে বলা হয়েছিল জাহাজে করে সেখানে নেওয়া হবে, কিন্তু পরে দেখি কাঠের ট্রলারে করে পাঠানো হচ্ছে।’ এ ছাড়া অনেক বিবাহিত নারীও তাদের শিশু সন্তানসহ সেখানে স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য দালালদের কাছে ধরনা দিয়ে থাকেন।

টেকনাফ উপক‚ল দিয়ে সাগরপথে মানবপাচার শুরু হয় ২০১০ সালে। এটি বেড়ে যায় ২০১২ সালের পর। পাচারকারীদের খপ্পরে পড়া অনেকেই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মৃত্যুকে বরণ করেন। ওই সময় থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উপকূলে অসংখ্য গণকবর আবিষ্কৃত হলে আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।

তখন সাগরপথে মানবপাচার বন্ধে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠে দেশের প্রশাসন। তখন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় টেকনাফ উপজেলার শাহপরীরদ্বীপের চিহ্নিত মানবপাচারকারী ধুলু হোসেন, সাবরাং কাটাবনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম ও হারিয়াখালীর জাফর আলম। এর পর বাকিরাও চলে যায় আত্মগোপনে। কমে আসে মানবপাচার। তবে গত কয়েক মাসের মধ্যে সাগরপথে ট্রলারে চেপে মালয়েশিয়াগামী প্রায় সাতশতাধিক লোককে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা সবাই বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা।

জানা যায়, বর্তমানে প্রতিটি ক্যাম্পেই সক্রিয় রয়েছে দালালচক্রের সদস্যরা। তারা অসহায় রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে আগ্রহী করে তুলছে। সর্বশেষ অবৈধপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে গত মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছে বঙ্গোপসাগরে রোহিঙ্গা-বোঝাই একটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। পরে সেখান থেকে ১৫ জনের লাশ এবং ৭৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করে কোস্টগার্ড ও নৌ-বাহিনী। এ ঘটনায় চার পাচারকারীকেও আটক করা হয়।

এ ঘটনায় উদ্ধার বালুখালীর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মো. জুবাইর জানান, কৌশলে তাদের ক্যাম্প থেকে নিয়ে আসে টেকনাফ বাহারছড়া নোয়াখালীপাড়ার সৈয়দ আলম ও নুরুল আলম। তাদের একদিন রাখা হয় পাশের জুমপাড়া পাহাড়ে। গত সোমবার রাতে একটি ট্রলারে ১৪৮ জনকে তুলে দেয়। মঙ্গলবার ভোররাতে সেন্টমার্টিনের অদূরে পশ্চিমে পাথরে সঙ্গে ধাক্কা লেগে ট্রলারটির তলা ফেটে ঢুবে যায়। তবে দুর্ঘটনাটি সকালের দিকে হওয়ায় অনেক প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পরিবারের কথা চিন্তা করে, উন্নত জীবনের আশায় এ পথে মালয়েশিয়া যেতে চাইলাম। কিন্তু আজ সবই শেষ হয়ে যেত।’ উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া ক্যাম্পের আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার এক ভাই মালয়েশিয়ায় রয়েছে। তার কথামতো দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে যাচ্ছিলাম।’

এ বিষয়ে নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, ‘দালালদের মাধ্যমে যারা পাসপোর্ট করাতে পেরেছেন, তারা বাংলাদেশি সেজে আকাশপথে মালয়েশিয়াসহ মধ্যপাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। কিন্তু সম্প্রতি সময়ে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করা নিয়ে সরকার কঠোর নজরদারি থাকায় অবৈধভাবে সাগরপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া যেতে রাজি হচ্ছেন অনেকেই। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দালালচক্রের সদস্যরা পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ চক্রের সদস্যরা কম টাকায় মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তাদের রাজি করায়। পরে সেখানে গিয়ে স্বজনদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার আগে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। তা দিতে ব্যর্থ হলে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের পর খারাপ জায়গায় তাদের বিক্রি করে দেয়।’

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ছালামত উল্লাহ বলেন, ‘সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারকারী চক্রের সদস্যদের সঙ্গে এ দেশের স্থানীয় কিছু দালাল সম্পৃক্ত। শীতের সময় সাগর অনেকটা শান্ত থাকে, তাই দালালরা মানবপাচারের জন্য এ মৌসুমকে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে ওঠে।’ টেকনাফ র‌্যাব-১৫ সিপিসি-১ এর কেম্পানি কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কমান্ডার মির্জা শাহেদ মাহতাব আমাদের সময়কে বলেন, ‘মানবপাচারকারীরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অসহায় নাগরিকদের টার্গেট করে আবারও সাগরপথে মানবপাচারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সেই অপচেষ্টা প্রতিরোধের জন্য অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

ট্রলারডুবির ২৪ ঘণ্টা পর একজন উদ্ধার : ট্রলারডুবির প্রায় ২৪ ঘণ্টার পর সেন্টমার্টিন এলাকা থেকে আরও এক রোহিঙ্গাকে জীবিত উদ্ধার করেছেন নৌবাহিনীর সদস্যরা। গতকাল বুধবার সকাল ৭টার দিকে মুমূর্যু অবস্থায় তাকে উদ্ধারের পর দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ বিষয়ে নৌবাহিনীর সেন্টমার্টিন স্টেশন কমান্ডার লে. এসএম জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গা-বোঝাই ট্রলারডুবির ঘটনায় দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান শুরুর পর স্থলভাগ থেকে এক যুবককে পাওয়া যায়। তিনি মুমূর্যু থাকায় নাম-পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। তাকে দ্রুত সেন্টমার্টিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাকে নিয়ে জীবিত উদ্ধারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩ জনে। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত ১৫ রোহিঙ্গার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।’

আট দালাল আটক : টলারডুবির ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন নডড়েচড়ে বসেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও উপক‚লীয় এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। অভিযান চালিয়ে পাচারের সঙ্গে জড়িত ৮ দালালকে আটক করেছে কোস্টগার্ড ও পুলিশ। এরা হলো ফয়েজ আহমদ (৪৮), আবদুল আজিজ (৩০), মো. উসমান (১৭), সৈয়দ আলম (২৭), সাদ্দাম (২৫), আইয়ুব (৩৫), হুমায়ুন (৩৭) ও রফিক (২৮)। এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ জানান, ট্রলারডুবির ঘটনায় কোস্টগার্ড বাদী হয়ে ১৯ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে। এরই মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আট দালালকে আটক করা হয়েছে। বাকিদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত আছে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক (কক্সবাজার) সরওয়ার আজম মানিক।

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com