শনিবার, ০৪ Jul ২০২০, ০৭:০৪ অপরাহ্ন

নিকলী হাওর আর জালালপুর ইকো রিসোর্ট এর ভ্রমণ গদ্য

নিকলী হাওর আর জালালপুর ইকো রিসোর্ট এর ভ্রমণ গদ্য

রাজু আহমেদ :
“শেষ কবে গ্রামে গিয়েছিলেন বেড়াতে? আপনি অথবা আপনার পরিবারের ছোট্ট মানুষটি? কবে দেখেছেন ভোর, সাথে হিমেল বাতাস আর মোরগের ডাক? কবে হেঁটেছেন গ্রামের মেঠো পথে অথবা চা খেতে কোন ছোট বাজারে? কখনো দেখেছেন ফসলের মাঠ দূর অবারিত…যতদূর চোখ যায়? ধানের সময় ধান আর সরিষার সময় সরিষা…
শীতের কুয়াশা, বসন্তের কুহুতান, আর বর্ষার বৃষ্টিস্নাত মাটির সোঁদা সোঁদা গন্ধ। মাটির চুলার রান্না শেষ কবে খেয়েছেন? মনে কি আছে সেই স্বাদ আদৌ?
জমিতে গরু নিয়ে হাল দেয়া অথবা জাল দিয়ে মাছ ধরা অনেকের কাছেই এখন শুধুই ছবি। ছোট্ট মনিকে হয়তো শুধু গল্পই বলে যেতে হবে গ্রাম, গ্রামের জীবন আর গ্রামের মানুষ গুলোকে নিয়ে।
এমনি কিছু ভাবনা আর কল্পনা বিলাস এর একটি নাম JALALPUR ECO RESORT. গ্রাম নিয়ে আমাদের কল্পনার জানালা জুড়ে যত ছবি সম্ভবত সব কিছু পূরণ করার একটি ছোট প্রয়াস আমাদের এই JALALPUR ECO রিসোর্ট” ।
উপরের লিখাটা জালালপুর ইকো রিসোর্ট এর ফেইসবুক পেইজ থেকে নেয়া । এইতো গত শীতে করুণাময় বিশ্বের পূর্বমুহূর্তে আমরা গ্রীন এক্সপ্লোর সোসাইটি থেকে প্ল্যান করলাম ঢাকার আশপাশের কোনো একটি জায়গায় ফুল ডে আউট প্রোগ্রাম করার l ভোটাভুটিতে সর্বোচচ নম্বর পেয়ে দেখা গেলো নিকলী হাওর এক নম্বর পছন্দ সবার l যেমন ভাবা তেমনি কাজ l ঢাকা থেকে নিকলী হাওর প্ল্যান করতে গিয়ে মনে হলো আশপাশে কোথাও একটি রাত কাটালে কেমন হয় l শুরু হয় গুগল মামার ধর্ণা। তবে বেশি এনালাইসিস দরকার পরে নি । Tripadvisor আর ফেইসবুক রিভিউ এর কল্যাণে জালালপুর ইকো রিসোর্ট নামটাই চলে এলো সামনে l কিশোরগঞ্জ শহর আর আশপাশের হোটেল দেখে পরে মনে হলো আমাদের টুর এর বেস্ট ডিসিশন ছিল জালালপুর ইকো রিসোর্ট কে বেছে নেয়া । যেহেতু গ্রুপে কয়েকজন মেয়ে ছিল এই রিসোর্ট ছাড়া অন্য হোটেলগুলো নিলে বোকামি শুধু হতো না মার খাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাবে না ।
যাই হোক, আমাদের যাত্রা শুরু হয় অনেক সকালে যেহেতু আমাদের প্ল্যান ছিল নিকলী হাওর ঘুরে তারপর রিসোর্ট এ গিয়ে লাঞ্চ করার । নিকলী হাওর এর উপর আরেকটি প্রতিবেদন খুব শীগ্রই আসছে । আজকের রিপোর্টটির মূল প্রতিপাদ্য জালালপুর ইকো রিসোর্ট ।
ঢাকা থেকে আনুমানিক ৯০-১০০ কিলোমিটার দূরে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা রাস্তা পেরিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম জালালপুর। কটিয়াদী থেকে ৩ কিলোমিটার ভিতরে গ্রামটির অবস্থান। যারা নিকলী যাবেন তারা কিন্তু কটিয়াদী পার হয়ে আরো প্রায় তিরিশ মিনিটে পৌঁছবেন নিকলী হাওরে l গুগল ম্যাপে রিসোর্ট আর নিকলী হাওর এর দূরত্ব আনুমানিক ছাব্বিশ কিলোমিটার । মানে ঢাকা থেকে আসলে প্রথমে রিসোর্ট পড়বে তারপর নিকলী হাওর l যারাই রিসোর্ট আর নিকলী হাওর একসাথে প্ল্যান করবেন তারা এই লোকেশন এর ব্যাপারটা মাথায় নিবেন l কারণ আপনি যদি চান বিকেলে হাওরে ঘুরতে, তখন প্রথমে রিসোর্টে এসে লাঞ্চ করে বের হওয়াটাই বেস্ট অপশন ।
যাই হোক রিসোর্ট প্রসঙ্গে আসা যাক । গুগল ম্যাপ ধরে খুব সহজেই নিকলী থেকে পৌঁছে যাই রিসোর্টে l বেলা তখন একটা ছুঁই ছুঁই l ব্যাগপত্তর কোনোভাবে রুমে রেখে নিচতলার রেস্টুরেন্টএ বসে চক্ষু চড়কগাছ l বাবার জন্মে এতো আইটেম আর এতো ভর্তা দেখিনি । খেতে বসে বুজলাম আমরা যা খাই তা আমাদের ক্যাপাসিটি না l আমাদের লিমিট কত তা দেখার জন্য আমরা কত প্লেট ভাত শুধু ভর্তা দিয়ে খেয়েছি তা দেখতে হবে l সম্ভবত প্রায় বিশ প্রকার ভর্তা ছিল l আরো ছিল চিকেন কারি, ফিশ কারি , ডাল , আরো অনেক কিছু l আর সবার শেষে মিষ্টি l ও আরো আছে l রিসোর্টে চেক ইন করার সাথে সাথে ছিল লেমন জুস l বুঝুন ঠেলা l এই খাওয়া খেয়ে কি ঘুমাবো রিসোর্ট ম্যানেজার জিহান এসে বললো স্যার বিকেলে আপনাদের গ্রাম ঘুরাতে নিয়ে যাবো l রিকশা চলে আসবে চারটায় l।ততক্ষনে ঘুমের প্ল্যান বাদ l ভাবলাম রিসোর্ট এর চারপাশে দেখি l ভিতরের সুইমিং পুলটা এতক্ষন নজরেই পড়েনি । যখন পুলের কাছে গেলাম অদ্ভুত এক ভালো লাগা শুরু । তখনি মনে হলো কিশোরগঞ্জে এক রাত থাকা আর এই রিসোর্ট বেছে নেয়াটা আমাদের জন্য ভালো ডিসিশন ছিল । যা বলসিলাম পুলটা ইনফিনিটি কনসেপ্ট এ করা । যারা বালি ট্রাভেল করেছেন তাদের কাছে মনে হবে উবুদ এর কোনো রিসোর্ট আর পুল l উবুদের রিসোর্ট গুলো একই ভাবে ক্ষেতের দিকে মুখ করে করা যাতে সুইমিং করার সময় সুবিশাল রাইস terrace দেখতে পারেন সহজেই ।পুলের পাশেই লাগোয়া একটা মাচা “খেতসমুদ্র” । মাচাটা হাফ শেড দেয়া হাফ খোলা । আর যতদূর চোখ যায় শুধু ধানক্ষেত আর ধানক্ষেত l মাচায় বসে আমাদের প্রথম তিরিশ মিনিট আমাদের আলোচনা ছিল কতটা ভালো ডিসিশন নিয়েছি রিসোর্টটা পিক করে আর কার মাথা থেকে এরকম খেতসমুদ্র নাম আসতে পারে আর এই ধরণের ক্ষেতের উপর পুল আর মাচা করার চিন্তা ।

তার আগে বলে নেই আমাদের রুমগুলো কেমন ছিল । রুমের গুণগত মান যেকোনো থ্রী বা ফোরস্টার হোটেলের মতো হলেও আমি বলবো এখানেও আছে স্বকীয়তা । মিনিমাম ফার্নিচারএ একটি হোটেল রুম কিভাবে সাজানো যায় সেই স্বকীয়তা l রুমে ঢুকলেই মনে হয় চারপাশ খোলামেলা অনেক জায়গা । আসলে যতটুকু ফার্নিচার দরকার তার একচুলও বেশি দিয়ে রুমগুলো সাজানো হয়নি । আমরা যারা মিনিমাল ফার্নিচার পসন্দ করি তাদের জন্য আসলেই চমৎকার একটি পরিবেশনা ।
আর , হ্যাঁ আমাদের রুম এর দামে চার বেলা খাওয়া এবং সাইটসিইং অন্তর্ভুক্ত ছিল । রিসোর্টের অনেকগুলো প্যাকেজের মধ্যে আমরা প্যাকেজ এ বেছে নেই । পার পারসন আমাদের খরচ হয় তিন হাজার পাঁচশো টাকার মতো যেখানে রুম, সব খাওয়া, পুল, সাইটসিইং সব অন্তর্ভুক্ত ছিল । পরে একটা আফসোস থেকে গিয়েছিলো l আর সেটি হলো রিসোর্ট থেকে নিকলী হাওর ঘুরার প্যাকেজটি নিলে সম্ভবত আমরা আরো ভালো করতাম ।
যাইহোক, যথাসময়ে রিকশা হাজির । বিকেল চারটা থেকে গ্রাম ঘুরিয়ে দেখার পরিকল্পনা । আমরা প্রায় একঘন্টা ঘুরে হাজির হলাম মরুদ্বীপ নামে স্থানীয় একটি নেচার পার্কে। পার্কটিতে তখনও কাজ চলছিল । পার্কটি মূলত একটি ওয়াটার বডি আর নানা প্রজাতির গাছগাছালির মেলা । আধাঘণ্টা পার্কটিতে ঘুরে রিসোর্ট আসতে আসতে বেলা প্রায় সাড়ে ছয়টা । সন্ধ্যা হয়ে গেছে ।
রিসোর্টে এসে পরবর্তী চমক তখনও অপেক্ষায় । লাল নীল বাতিতে রিসোর্টের চারপাশ তখন আলোর বন্যায় প্লাবিত । সবাই আবারো হুড়াহুড়ি করে মাচায় ছুটে যাই সূর্যাস্তের শেষ রং দেখবো বলে আর রঙিন লাইটিং এর ঝমকানি । ভালো করে দেখে বুজলাম প্রতিটা লাইট আসলে হ্যারিকেন এর ভিতরে বালব । গ্রামের ভিতরে এতো সব ক্রিয়েটিভ চিন্তা ভাবনা আসলেই অবাক হই l এগিয়ে যাচ্ছে দেশ ।
একটু পরেই ডাক আসে রুফটপ যেতে হবে । কেনোরে বাবা ? রুফটপ রেস্টুরেন্টে বার বি কিউ এন্তেজাম করা হয়েছে l দুপুরের খাওয়ার রেশ তখনও যায়নি । রুফটপ এ গিয়ে আরেক রাউন্ড অবাক হওয়ার পালা । রেস্তোরাঁটার নাম রাখা হয়েছে “চাঁদ জোনাকি ” । ওপেন এয়ার রুফটপ । চারদিক খোলা । রাতের আকাশ আর রঙিন লাইটিং আর সাথে বার বি কিউ ধোঁয়া অদ্ভুত এক আবহ চারপাশে । এদিকে মুভি চলছে প্রজেক্টরে । লাইফ এর বেস্ট বার বি কিউ মুরগি চিবুতে চিবুতে শুনি এখন আমাদের বডি মাসাজ দেয়া হবে । যে ব্যক্তিটি মাসাজ করবেন তার নামটাও অদ্ভুত – মিস্টার বুলেট l বুলেটের নরম হাতে মাসাজ নিতে নিতে জানলাম তার এই নামটি রিসোর্ট এর মালিক আদর করে তাকে দিয়েছেন l কোন ফাঁকে ঘুমিয়ে পড়েছি খবর ছিল না ।
কিসুক্ষনের মধ্যেই ডাক পড়লো ডিনারের । এবার মেনুতে পুলাও, রোস্ট , বীফ , চাইনিজ সবজি । আর রস মালাই ।আমি বা আমরা কত বড় খাদক এই ট্রিপ এর আগে বুঝিনি । পরে বের করলাম রিসোর্টটিতে রান্না হয় মাটির চুলায় । আর যেদিন যতজন গেস্ট ততটুকুই বাজার হয় আর রান্না হয় । কোনো খাওয়া স্টোর করা হয় না । যা বেঁচে যাবে খাওয়া ঐদিন আশপাশে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হবে ।
ঐদিন এতো টায়ার্ড ছিলাম আর এতো খাবার পর বেহুশের মতো ঘুম সবার চোখে । পরদিন সবার প্ল্যান জেনে ঘুমিয়ে পড়ি l অনেক সকালে উঠতে হবে।
পরদিন ঘুম ভাঙে মোরগের ডাকে । চারদিকে একটু অন্ধকার l অন্যদের ডেকে সোজা মাচায় বসে সূর্যিমামা দর্শন l এযেন দেশের ভিতরে বিদেশী অনুভূতি । এতদিন সূর্য উঠা আর দেখা ছিল হিল স্টেশন কেন্দ্রিক । গ্রামের ভিতরে চারপাশে ধানক্ষেত আর শীতের সকালে কুয়াশায় সূর্য দেখা সম্ভবত আমাদের ট্রিপ এর বেস্ট পার্ট । ঘন্টা খানেক মাচায় কাটিয়ে প্ল্যান করলাম ব্রেকফাস্ট এর আগে আনন্দ বাজার যাবো, যেটা রিসোর্ট থেকে হেটে দশ মিনিটের পথ l আগেরদিন রিকশা নিয়ে গ্রাম ঘুরার লাভ হলো আশপাশে সবই চিনে গেছি l আর যা বুঝলাম রিসোর্ট মালিক আর তার পরিবার এলাকায় খুবই প্রতিপত্তিশালী l কারণ যখনি রিসোর্ট স্টাফ কে জিজ্ঞেস করলাম হেঁটে ঘুরে নিরাপদ কিনা তারা হেঁসে বলেছিলো আপনারা রিসোর্টের গেস্ট এতটুকুই যথেষ্ট । কুচ পরোয়া নেহি । যাই হোক হেঁটে আনন্দবাজার গিয়ে দেখি মাত্র বাজার বসা শুরু হয়েছে । রিকশা সাইকেল করে গ্রামের ভিতর থেকে সবজি মাছ আসছে একের পর এক । একটা ধোঁয়া উঠা চা খেয়ে ফিরতি পথ ধরি রিসোর্টের । ব্রেকফাস্ট করে কাওয়া বাথ নিতে হবে । ইয়াহু
যেহেতু রিসোর্টের খাবার সম্পর্কে আইডিয়া হয়ে আছে, ব্রেকফাস্ট যে ঐরকমই হবে তা বলা বাহুল্য । গতকাল দুপুর থেকে সকালে ব্রেকফাস্ট পর্যন্ত চারটা মিল হিসেব কষে বের করলাম রিসোর্টটি যা চার্জ করছে তা কোনো ভাবেই বেশি নয় বরং কম l বলে রাখা ভালো রুম প্রাইস একটু বেশি এই গ্রুপ এ যে দুই একজন ছিল তারাও এখন একমত ।
ব্রেকফাস্ট করতে করতে কাওয়া বাথ রেডি । একটু গুগল সার্চ করে বুঝলাম এটি হলো ফিলিপিন্স এর খুব পপুলার একটি কনসেপ্ট যেখানে আপনি একটা বড় হাড়িতে বসে থাকেন আর নিচে আগুন জ্বলতে থাকে । ইউনিক এই ধারণটি নাকি জালালপুর ইকো রিসোর্টেই প্রথম বাংলাদেশের মধ্যে l LIVE Cooked হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সুইমিং পুলে l শীতের সকাল হলেও গরম পানিতে বসে এখন পুরো ফিট পুলে নামার জন্য l প্রায় আধা ঘন্টা পুলে কাটিয়ে এবার প্রস্তুতি নেয়ার পালা ফিরতি পথের । কারণ আমাদের প্ল্যান হলো ঢাকায় ফিরে লাঞ্চ করা । আর সাথে নিয়ে আশা খেতসমুদ্র , চাঁদ জোনাকি , ভোরে সূর্য দেখার না ভোলা কিছু স্মৃতি ।
সত্যি ফিরে যেতে মন চাইছিলো না ।
লাভ ইউ জালালপুর ইকো রিসোর্ট।

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com