সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০৩:২৫ পূর্বাহ্ন

মুসলিম জাতিসত্তার সুরক্ষায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব

মুসলিম জাতিসত্তার সুরক্ষায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব

সংকটকালে হতাশার কারণ : মুসলিম জাতি একটি সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। অনুভূতিশীল মানুষদের পরাজয় ও হতাশার গ্লানি পেয়ে বসেছে। তবে হতাশা ও আশাহত হওয়ার কারণ সম্ভবত অতীতের ঘটনাপ্রবাহ ও ইতিহাস সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা। বিপরীতে যারা ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানে, যারা পূর্ববর্তী মুসলিমদের ধৈর্য ও পরীক্ষা বিষয়ে অবগত এবং যারা ইসলামের বিরুদ্ধে করা নানা ষড়যন্ত্র এবং তা থেকে জাতিকে উদ্ধারে আলেমসমাজ ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্বের কর্মকৌশল ও দৃঢ়তার খবর রাখে তারা ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী। তাদের শরিয়তের দ্বিধাহীন আনুগত্য, আল্লাহর প্রতি নিবেদন ও কাজে-কর্মে নিষ্ঠার বদৌলতে উপায়-উপকরণহীন হওয়ার পরও আল্লাহ তাদের সাফল্য দান করেন। তারা দ্বিনি সংগ্রামে বিজয়ী হন।

সুতরাং সংকট মুসলিম জাতির জন্য নতুন কিছু নয়। মুসলিম জাতি সংকট দেখে হীনমন্য হয় না এবং দ্বিনি কাজের প্রত্যয়ও তারা ভুলে যায় না; বরং তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনায়ও কোনো ভাটা পড়ে না। অতীতে যখনই ইসলাম ও মুসলিম জাতির ওপর কোনো সংকট নেমে এসেছে, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও আলেমসমাজের আত্মবিশ্বাস ও উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়েছে। সে সময় তাঁরা ধর্মীয় শিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। সংকট তাঁদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করত এবং কর্মস্পৃহা বাড়িয়ে দিত।

সচেতনতা ও পাপমুক্ত জীবনে আসে বিজয় : বিপদ ও সংকটের সময় যখনই মুসলিমরা ধৈর্য, সহনশীলতা, প্রজ্ঞা, চিন্তা-গবেষণা, ঈমান ও বিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবেলা করে, সঙ্গে সঙ্গে পাপ পরিহার করে এবং নিজেদের কাজের ব্যাপারে সতর্ক থাকে আল্লাহর সাহায্যে তারা বিজয়ী হয়েছে। বিষয়টি তাদের কাছে বেশি স্পষ্ট, যারা ইসলামের ইতিহাসের জয়-পরাজয় উভয় অধ্যায় সম্পর্কে জ্ঞাত। প্রথম অধ্যায়ে প্রথম যুগের মুসলিমরা গৌরবোজ্জ্বল বিজয় লাভ করেছে এবং বিশাল বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। যারা ছিল অপরাজেয়। সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে তারা নিজেদের দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। দ্বিতীয় অধ্যায়ে মুসলিমরা কঠিন সময় পার করেছে এবং ভয়াবহ পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাদের অন্যায় ও অবিচারের লক্ষ্যে পরিণত করে রাখা হয়েছিল, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। আর যত দিন না মুসলিম জাতি নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে প্রয়াসী হবে, তত দিন তাদের ওপর অবিচারের ধারা চলতে থাকবে।

ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর বিজয় আসে : ইতিহাসসচেতন ব্যক্তিরা জানেন, মুসলিম জাতির সাফল্য কোনো সাময়িক প্রচেষ্টার ফল নয়; বরং তা ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। ইস্তাম্বুল বিজয়ের জন্য মুসলিম বাহিনীকে ১১-১২ বার অবরোধ আরোপ করতে হয়েছিল। প্রথম অবরোধের সময় আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর মতো মহান সাহাবি অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু (৫২ হি.) হলে ইস্তাম্বুল দুর্গের প্রাচীরের ছায়ায় তাঁকে দাফন করা হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ৮৫৭ হিজরিতে মোতাবেক ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ ইস্তাম্বুল বিজয় করেন। একইভাবে বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলিমদের হাতছাড়া হওয়ার দীর্ঘ ৯০ বছর পর সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তা উদ্ধার করেন। তার আগে ইমামুদ্দিন জঙ্গি ও নুরুদ্দিন জঙ্গি তা উদ্ধারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

শত্রু যখন ইসলামের সেবক : ৬৫৬ হিজরিতে তাতার বাহিনী বাগদাদ নগরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। পরাক্রমশালী এ বাহিনীই ৬৮৫ হিজরিতে আইনে জালুতের যুদ্ধে মুসলমানের কাছে পরাজিত হয়। তাতার জাতির বড় একটি অংশ ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের সেবকে পরিণত হয়। উনিশ শতকের শেষভাবে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের উত্থান হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ মুসলিম অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এ সময় মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। শুধু ভারতের দিল্লি ও এর আশপাশে ব্রিটিশ বাহিনী যে ধ্বংস চালায়, তা নজিরবিহীন। এরপর ৫০ বছর ভারতবাসী স্বাধীনতাসংগ্রামে অতিবাহিত করে, যাতে লাখো মুসলিম জীবন উৎসর্গ করেছে। বিনিময়ে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে।

শত প্রতিকূলের মধ্যে ইসলামের ধ্রুবতারা : সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মুসলিম জাতিকে গোলামির জিঞ্জিরে বন্দি রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় মুসলিম জাতিকে দমন করতে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। তারা মুসলিম সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ শুরু করে, ইসলামী শিক্ষার চিরায়ত ধারা পাল্টে দেয়, নিজস্ব পাঠক্রম তৈরি করে, ইসলামের ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংসে তৎপর হয়, নতুনভাবে ইতিহাস রচনা শুরু করে, ধর্মীয় আইনের ওপর অনাস্থা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়, মুসলিম নামগুলো বদলে ফেলে; এমনকি ফরজ ইবাদত আদায়ে পর্যন্ত বাধা সৃষ্টি করে। এ ছাড়া মুসলিম, ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচারমাধ্যম, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, গোয়েন্দা বাহিনী, গোপন সংগঠন, অপপ্রচার ইত্যাদির প্রয়োগ করেছে। কিন্তু ইসলাম তার সত্যতা, শিক্ষা ও অন্তর্নিহিত শক্তির বদৌলতে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে।

ইসলাম ও মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে ইউরোপ সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি, বৈজ্ঞানিক উন্নতি ও রাজনৈতিক কূটকৌশল নিয়োজিত করেও ব্যর্থ হয়েছে। হাজারো বিরোধিতা ও বিধি-নিষেধের পরও পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে। পশ্চিমা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন মুসলিম চিন্তাবিদ ও দ্বিন প্রচারক তৈরি হয়েছে, যারা ঈমানি শক্তি, ধর্মীয় প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ববোধ ও দ্বিনের জন্য আত্মনিবেদনে সেসব মুসলিম কোনো অংশে পিছিয়ে নেই, যারা জন্মসূত্রে মুসলিম, যারা ইসলামী সমাজে বেড়ে উঠেছে।

ইউরোপে বাড়ছে ইসলামের প্রতি আগ্রহ : ইসলামের সত্যতা, জাদুকরী প্রভাব, ইসলামী শিক্ষার সুদূরপ্রসারী প্রভাব প্রমাণের এর চেয়ে বড় মাধ্যম কী হতে পারে যে, তাদের ইসলামবিরোধিতা প্রতিহত করতে এমন শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সম্পূর্ণ ইসলাম-বৈরী পরিবেশে হয়েছে। তারা ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেছে। ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসনকালে বহু মুসলিম যুবক ইউরোপীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। একজন ইংরেজ কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন—তারা এমন এক শিক্ষাক্রম চালু করেছে, যা মুসলিম সমাজের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে এমন একটি প্রজন্ম সৃষ্টি হয়েছে, যারা বাহ্যত মুসলিম হলেও তাদের চিন্তা-চেতনা অমুসলিমের মতো, বাহ্যত তারা স্বাধীন তবে চিন্তা-ভাবনায় পশ্চিমা

তারা স্বাধীন তবে চিন্তা-ভাবনায় পশ্চিমাদের দাস। বিপরীতে আল্লাহ পশ্চিমা বিশ্বে এমন এক শ্রেণি তৈরি করেছেন, যারা বাহ্যত পশ্চিমা কিন্তু তাদের অন্তর ইসলামের ভালোবাসায় ভরপুর। তাদের মন-মস্তিষ্ক ইসলামী চেতনায় সবুজ। যেখানে কোনো মসজিদ ছিল না সেখানে একাধিক মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার, ইসলামী পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ইউরোপীয় গণমাধ্যমেরই দাবি শিক্ষিত শ্রেণিতে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। ইসলামবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামের প্রতি নমনীয় হচ্ছে।

আবেগ-অনুভূতির পরাধীনতা : কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের পরাধীন হওয়া, যুদ্ধের ময়দানে হেরে যাওয়া সাময়িক ব্যাপার। ইসলামের ইতিহাসে এমন ঘটনা বারবার ঘটেছে। কিন্তু মন ও মস্তিষ্ক, চেতনা ও অনুভূতি এমন জিনিস, যা সময় ও পরিস্থিতি পাল্টে দেয়। ঔপনিবেশিক শাসনকালে পশ্চিমারা বিষয়টি বুঝতে পারে এবং সামরিক বিজয়ের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক বিজয়ের প্রতি মনোযোগ দেয় এবং তারা সাফল্য লাভ করে। পশ্চিমাদের এ আগ্রাসন এখনো চলছে। ফলে জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের হুমকিতে পড়েছে মুসলিমসহ বিশ্বের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী। মুসলিম জাতি যদি তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সচেতন না হয় তবে আগামী প্রজন্মের সামনে ভয়াবহ দুর্দিন অপেক্ষা করছে।

তামিরে হায়াত থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর

 

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com