রবিবার, ২৫ Jul ২০২১, ১০:৫৪ অপরাহ্ন

১০৫৭ জাল এনআইডি লক, ৫৫৬ মামলা

১০৫৭ জাল এনআইডি লক, ৫৫৬ মামলা

জালিয়াতি করে বাগিয়ে নেওয়া এক হাজার ৫৭টি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) লক করেছে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ। হয়েছে ৫৫৬টি মামলা। সম্প্রতি পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে বেশ কয়েকটি অসাধু সিন্ডিকেটের সদস্যরা জাল এসব এনআইডি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ হাতিয়ে নিয়েছে। জমির দলিল জালিয়াতিসহ অন্যান্য অপরাধেও এসব এনআইডি ব্যবহার হচ্ছে।

এ ধরনের দ্বৈত, জাল ও ভুয়া এনআইডি তৈরিতে সহায়তা দিয়েছেন খোদ জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কিছু অসাধু কর্মী। এমন ৪২ কর্মীকে বরখাস্তের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দ্বৈত এনআইডি নিয়ে সবাই অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন না। কেউ কেউ নিছক অজ্ঞতাবশত দ্বৈত এনআইডি নিয়েছেন। এ জন্য দ্বৈত এনআইডিধারীদের মধ্যে কাদের ‘খারাপ উদ্দেশ্য’ রয়েছে সেটি যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করা

হয়েছে। এভাবে তাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এমন এক হাজার ৫৭ জনের এনআইডি লক (অকার্যকর) করে তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ৫৫৬টি মামলা করেছে ইসির আইন বিভাগ।

ভুয়া এনআইডি তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ইসির ডাটা এন্ট্রি অপারেটরসহ ৯ জন গ্রেপ্তার হওয়ার পর মামলাটি তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিবি পুলিশ জানায়, এসব জাল এনআইডি ব্যবহার করে ইতোমধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অন্তত ১৪ কোটি টাকার ঋণ হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন তারা। এভাবে ঠিক কী পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে তা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) সহায়তা চেয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখল ও বিক্রিসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-েও যুক্ত এনআইডি জাল করার সিন্ডিকেটগুলোর সদস্যরা।

ডিবি জানায়, তাদের তদন্তে এসব অসাধু চক্রের আর্থিক লেনদেনের চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিটি এনআইডি তৈরির জন্য এক থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়েছে সিন্ডিকেট। এর মধ্যে ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পান। বাকি টাকা সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে অন্তত ১০ লাখ মানুষ দ্বৈত ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করেন। শুধু ২০১৯ সালে দুই লাখ ৭ হাজার ৬৩৫ জন দ্বিতীয়বার ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করেন। এর মধ্যে খারাপ উদ্দেশ্যে দ্বৈত ভোটার হওয়া এক হাজার ৫৭ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

এনআইডি অনুবিভাগ জানায়, আঙুলের ছাপ, ফেস রিডিং, চোখের মণির (আইরিশ) প্রতিচ্ছবি নেওয়াসহ সাতটি ধাপ পার হওয়ার পরই একজন ভোটার জাতীয় পরিচয়পত্র পান। আইন অনুযায়ী একজনের একাধিক এনআইডি পাওয়ার সুযোগ নেই। নিবন্ধিত সব ভোটারের আঙুলের ছাপ ও ব্যক্তিগত তথ্য ইসির সার্ভারে (জাতীয় তথ্যভা-ারে) সংরক্ষিত রয়েছে। কেউ দ্বিতীয়বার ভোটার হতে চাইলে তা সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এত সব নিরাপত্তা ফাঁক গলে মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে অবৈধ এনআইডি কার্ড।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এত সব নিয়ম থাকলেও কিছু অসাধু কর্মীর কারণে জাতীয় তথ্যভা-ারের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে একজনকে দুবার এনআইডি গ্রহণের সুযোগ করে দেন তারা। এভাবে অনেক রোহিঙ্গার হাতেও এনআইডি পৌঁছে গেছে।

জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির জন্য আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের ৪২ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইসি। এর মধ্যে সহকারী পরিচালক, টেকনিক্যাল এক্সপার্ট, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ও মেসেঞ্জার পদমর্যাদার কর্মী রয়েছেন। তারা সবাই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ইসিতে কাজ করতেন। তবে কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া শুধু আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা এমন জালিয়াতি করতে পারেন কিনা সেই প্রশ্নও উঠেছে।

জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, যারা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তারা যে সংস্থার লোকই হোক তাদের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। তিনটি তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছে কমিশন। তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল স্বাক্ষরের পাশাপাশি ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং আইরিশ স্ক্যান যুক্ত করা হয়েছে। এতে এখন চাইলেও অনিয়ম করা সম্ভব হবে না।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরের চিড়িয়াখানা রোডের ডি-ব্লক এলাকা থেকে দুই ইসি কর্মীসহ এনআইডি জালিয়াতি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তারা হলো- ইসির খিলগাঁও অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সিদ্ধার্থ শংকর সূত্রধর ও গুলশান অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আনোয়ারুল ইসলাম। তাদের সহযোগী সুমন পারভেজ, মজিদ ও আবদুল্লাহ আল মামুন। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে দ্বৈত, জাল ও নকল ১২টি এনআইডি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের মামলায় তাদের রিমান্ডে নেয় ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার বাইরের দুটি জেলা থেকে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়া চক্রটির বিরুদ্ধে হওয়া মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ডিবির লালবাগ বিভাগের সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের সহকারী কমিশনার (এসি) মধুসূদন দাস বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।

গত ৩০ আগস্ট দ্বৈত এনআইডি থাকায় বহুল আলোচিত জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করে ইসি। রাজধানীর বাড্ডা থানায় মামলাটি করেন গুলশান থানার নির্বাচন কর্মকর্তা মমিন মিয়া। এর আগে করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে ডা. সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত বছর জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি নেওয়ার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ধরা পড়ে চট্টগ্রামে। সেখানে রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরি করে দেওয়ায় কয়েকজন গ্রেপ্তারের পর তোলপাড় শুরু হয়। এ ছাড়াও গত বছর কুষ্টিয়া শহরের এনএস রোডের বাসিন্দা এমএ ওয়াদুদের পরিবারের সদস্যদের এনআইডি জাল করে তাদের জমি বিক্রি করে দেয় একটি সিন্ডিকেট।

 

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com