বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৭:২২ অপরাহ্ন

সৌরভ নয়, হতাশা ছড়িয়ে দিল ফুল

সৌরভ নয়, হতাশা ছড়িয়ে দিল ফুল

যে কোনো বিশেষ দিবস উদযাপনে সর্বাধিক কদর থাকে যে পণ্যটির, সেটি ফুল। হ্যাঁ, পণ্যই বটে। বিশেষ দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এখন কোটি কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। ভালোবাসার প্রতীক ফুল তাই হয়ে গেছে ব্যবসায় পণ্যও। এবং সঙ্গত কারণেই বিশেষ কোনো দিবস এগিয়ে এলে এ পণ্যটির উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদেরও থাকে বিশেষ প্রস্তুতি।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীদের বাড়তি প্রস্তুতি থাকে। এবারও ছিল। পাশাপাশি করোনা মহামারীর বিষয়টিও ছিল তাদের ভাবনায়। তাই চাওয়া ছিল কম। কিন্তু এর পরও দেখা গেছে, তাদের ধারণা আর বাস্তবতায় আকাশ-পাতাল ফারাক। ফলে ভীষণ হতাশ ফুলের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা, হতাশ ফুলচাষিরাও।

ফুল ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার ফুলের বাণিজ্য রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে ফুল অনেক কম বিক্রি হবে বলে আগে থেকেই ধারণা করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। সেভাবেই বিনিয়োগ করেছিলেন। এর পরও অন্তত ১০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে, এমনটাই আগাম ধারণা ছিল তাদের। কিন্তু আড়াই কোটি টাকার ফুলও বিক্রি হয়নি।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইমামুল হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, রাজধানীতে যেখানে দুই কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করেছিলাম, সেখানে বিক্রি হয়েছে ৩০ শতাংশেরও কম। বিপুল পরিমাণ ফুল অবিক্রীত থাকায় পচে যাচ্ছে। কেবল রাজধানীতেই ২০ ট্রাকের মতো ফুল ফেলে দিতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। তিনি জানান, মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবার ফুলের বিক্রি কম হয়েছে। পাশাপাশি দিবসটি ঘিরে এবার অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ ও সেমিনারের আয়োজন অনেক কম হয়েছে। আসছে স্বাধীনতা

দিবসে ও বাংলা নববর্ষেও ফুলের বাজারে এমন পতন ঘটতে পারে, এমন শঙ্কায় রয়েছেন, জানালেন ফুল ব্যবসায়ীরা।

প্রতিবারের মতো এবারও একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফুল সংগ্রহ করে রাজধানীতে বিক্রি করেছেন পাইকার ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম। শাহবাগ ফুলের পাইকারি বাজারের এ ব্যবসায়ী জানান, দিবসটিকে কেন্দ্র করে এবার এক লাখ ২০ হাজার টাকার ফুল কিনে মাত্র ৩২ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করতে পেরেছেন। এখন গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে অবিক্রীত ফুলের স্তূপ।

শাহবাগের পাইকারি প্রতিষ্ঠান বনকিস ফ্লাওয়ার শপের কর্ণধার রফিকুল বলেন, মূলত ১৮ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি তিন দিন একুশে ফেব্রুয়ারির ফুল বিক্রি হয় আমাদের বাজারে। এবার এসব দিনে অনেক কম বিক্রি হয়েছে। ফুল কাঁচা পণ্য। তাই বেশিদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। অবিক্রীত ফুলে ইতোমধ্যেই পচন ধরেছে। আমারই প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফুল ফেলে দিতে হয়েছে। এখন যে পরিমাণ ফুল হাতে রয়েছে, তা পানির দর হেঁকেও বিক্রি করতে পারছি না।

রফিকুল বলেন, গোলাপের বিক্রিই সব থেকে বেশি হয় রাজধানীতে। যশোর থেকে ১০০ পিস গোলাপ ২০০ থেকে ১৫০ টাকা দরে কিনেছি। প্রথম দিকে দাম পেলেও বিক্রি হয়েছে অনেক কম। আজ (সোমবার) সকালে পাইকারি বাজারে গোলাপের ৩০০ পিসের বান্ডেল ১৫০ টাকা এবং ১০০ পিসের বান্ডেল বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। এ হিসাবে প্রতি পিস গোলাপের দাম পড়ছে মাত্র ৫০ পয়সা। এ দামেও বিক্রি হচ্ছে না গোলাপ।

একইভাবে অন্যান্য ফুলের দামও কমেছে। পাইকার ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে রজনীগন্ধার পিস ২ টাকা, জারবেরা ৪ টাকা, গাদার ধুপ্পি ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ দামেও ফুল বিক্রি হচ্ছে না। তাদের দাবি, এবার প্রত্যাশা কম থাকলেও সে অনুযায়ী ফুল বিক্রি হয়নি, উল্টো বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে রয়েছেন তারা।

শাহবাগের পাইকারি ফুলের দোকান ফুলতলা ফ্লাওয়ার শপের কর্ণধার মো. মেরিন শেখ বলেন, এবার ফুল বিক্রি কম হওয়ায় ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে পাইকারিতে ফুলের দাম পড়তে শুরু করে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পাইকারিতে গোলাপ বিক্রি হয় ১০ থেকে ১২ টাকা পিস দরে। বিক্রি কমে যাওয়ায় ২০ ফেব্রুয়ারি দাম কমে হয় ৮ টাকা। আজ (২২ ফেব্রুয়ারি) ভালো মানের গোলাপ এক টাকা এবং সাধারণ গোলাপ বিক্রি হচ্ছে ৫০ পয়সাতে। এ দামেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।

অন্য ফুলের বেলায়ও একই অবস্থা জানিয়ে মেরিন আরও বলেন, যশোর থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার ফুল কিনেছিলাম। এখনো দুই লাখ টাকার ফুল অবিক্রীত রয়েছে আমার। আগামী এক-দুদিনের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে বড় লোকসান হবে আমার।

ঢাকা ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি শ্রী বাবুল প্রসাদ বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কেবল গদখালি থেকে রাজধানীর আগারগাঁও ফুল বাজারে ৩ ট্রাক এবং শাহবাগ ফুল বাজারে ১২ ট্রাক ফুল এসেছে। এর মধ্যে ৯ ট্রাকের মতো ফুল এখনো রয়ে গেছে। ১৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ফুলের দাম কমতে শুরু করে। তবে বিক্রি বাড়েনি। ফুল সংরক্ষণেরও কোনো উপায় নেই। সুতরাং অবিক্রীত ফুল নিয়ে মহাবিপদে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। বড় লোকসান হয়ে গেছে তাদের।

শাহবাগ বটতলা ক্ষুদ্র ফুল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদও বলেন, করোনার কারণে এখানকার প্রত্যেকটি ব্যবসায়ী বড় ক্ষতির মুখে রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবসা অচল থাকায় সবাই কষ্টেসৃষ্টে জীবনধারণ করছেন। করোনা থাবা বসানোর পর ব্যবসায়ে কঠিন মন্দাভাব দেখা দেয়। ভেবেছিলাম, একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে সেই মন্দাভাব অন্তত কেটে যাবে। কিন্তু বিক্রি এতটাই কম হয়েছে যে, লাভ তো দূরের কথা, ফুল ব্যবসায়ীরা লোকসান কতটা কমানো যায়, তা নিয়ে চিন্তিত। শাহবাগের খুচরা প্রতিষ্ঠান শাহজালাল পুষ্পালয়ের কর্ণধার গুলেশাহ বেগমের কাছে বিক্রি কেমন জানতে চাইলে হতাশার সঙ্গে বলেন, ‘নেই বললেই চলে।’

 

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com