সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ০৭:১০ অপরাহ্ন

আড়ালেই থাকছে বিদেশি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী গডফাদাররা

আড়ালেই থাকছে বিদেশি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী গডফাদাররা

ইউরোপে উচ্চবেতনে চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে পাচারের পর জিম্মি রেখে মুক্তিপণ আদায় এবং লিবিয়ায় মাফিয়াদের হাতে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার তদন্ত শেষ করেছে সিআইডি। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় দায়ের হওয়া ২৬ মামলার মধ্যে সিআইডির তদন্ত করা ১৪টি মানবপাচার মামলায় এ মাসেই আদালতে চার্জশিট দাখিলের কথা রয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় দায়ের ১২টি মামলার মধ্যে ৯টির চার্জশিট ইতোমধ্যে দাখিল হয়েছে। এসব মামলায় বাংলাদেশি বিভিন্ন শ্রেণির দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি ও মানবপাচারকারীদের আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত মোট গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭১ জনকে। গ্রেপ্তারকৃত এবং লিবিয়ার ওই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশি এসব মানবপাচারকারীর নাম উঠে আসে।

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনশক্তি হিসেবে ইউরোপে রপ্তানির নামে মাঝপথে লিবিয়ার মিসদাহ মরুভূমিতে ২৬ জনকে হত্যা এবং ১১ জনকে হত্যাচেষ্টায় বাংলাদেশি গডফাদারদের পাশাপাশি লিবিয়ার সন্ত্রাসী মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং গডফাদাররা জড়িত। এই চক্রের সদস্যদের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে লিবিয়ার কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে; কিন্তু সে দেশের পক্ষ থেকে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও গডফাদারদের কোনো তথ্য প্রদান করা হয়নি। এতে আড়ালেই থাকছে আন্তর্জাতিক এই চক্র।

তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী মিসদাহ মরুভূমিতে ওই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা বলে পরিচিত লিবিয়ান শীর্ষ মানবপাচারকারী খলিফা হাফতারের দলের মিলিশিয়া খালেদ আল-মিশাই গত বছরের ২ জুন দেশটির ঘারিয়ান শহরের দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হয়। এ ছাড়া একই ঘটনার আরেক অন্যতম সন্দেহভাজনকে ঘারিয়ান শহর থেকে গত ১ মার্চ গ্রেপ্তার করে ত্রিপোলি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ২৩ বছর বয়সী ওই যুবক হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছে।

এদিকে গত ৫ জানুয়ারি ইতালির কসেঞ্জা প্রভিন্সের কসেঞ্জা শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ওই ঘটনায় জড়িত বাংলাদেশি মানবপাচারকারী জাফর ইকবালকে। সিআইডি বলছে, জাফরকে ফেরত আনতে ইতালি পুলিশ বিভাগের কাছে আবেদনে সাড়া পাওয়া গেছে। আগামী ৭ এপ্রিল এ বিষয়ে ইতালির আদালতে শুনানি হবে। এতে নির্ধারণ করা হবে জাফরকে ফেরত পাঠানো হবে, নাকি ইতালিতেই তার বিচার চলবে। ইতোমধ্যে জাফরের বিরুদ্ধে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করেছে।

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম আক্তারুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, লিবিয়ান মিলিশিয়াদের হাতে যে ২৬ বাংলাদেশি হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্যে আকাশ ওরফে সাদ্দাম হোসেন, মাহবুব, মোহাম্মদ আলী, মাসুদ মিয়া এবং রাজন- এই ৬ জনকে পাচার করে জাফর ইকবালের নেতৃত্বাধীন চক্র। একই ঘটনায় সজল, জানু মিয়া এবং সৌরভ নামে আরও তিনজন আহত হয়েছিলেন। জাফর ইকবাল এবং ভূক্তভোগীদের প্রত্যেকের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। ইতালির আদালত জাফরকে বাংলাদেশে ফেরতের আদেশ দিলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে আনা হবে। পাশাপাশি সিআইডির একটি টিম ইতালি ও লিবিয়ায় সরেজমিন তদন্ত করার কথা রয়েছে। এসব কার্যক্রম শেষ হলে বহুদেশীয় মানবপাচারকারী পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

পুলিশ বলছে, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির অনুমতি নেই; কিন্তু মানবপাচারকারী চক্রের স্থানীয় দালালরা বিভিন্ন জেলা; বিশেষ করে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং সিলেটের তরুণদের ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স জার্মানি, গ্রিস, সাইপ্রাস পাঠানোর প্রলোভন দেখাত। ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত এভাবে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের ঢাকায় এনে জড়ো করে আকাশপথের চারটি রুট ব্যবহার করে লিবিয়া পাঠানো হতো। এ ক্ষেত্রে দুবাইয়ের এক মাসের ট্রাভেল ভিসা সংগ্রহ বা ভারতে অবস্থিত লিবিয়ার দূতাবাস থেকে ট্রাভেল ভিসা সংগ্রহ করত চক্রের সদস্যরা।

তদন্তে পুলিশ আরও জেনেছে, লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে নৌকাযোগে পাচারের শিকার কিছু বাংলাদেশিকে অবৈধভাবে ইতালির উপকূলীয় শহর কসেঞ্জা, নেপলসে পাঠিয়ে বিদেশগামীদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করে এই চক্রের সদস্যরা। সে সুবাদে ইতালিতে যাতায়াতও ছিল গডফাদারদের। এর আগে বাংলাদেশে অবস্থানের সময় লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া, লিবিয়ায় জিম্মি রেখে মুক্তিপণ আদায়ের কয়েকটি ধাপের মুখোমুখি হতে হয় ভুক্তভোগীদের।

২০১৯ সালের মে মাসে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৫০ কিলোমিটারের বেশি দক্ষিণের শহর মিজদাহয় মানব পাচারকারীদের হাতে অপহরণের শিকার হন ৩৮ বাংলাদেশি। পরে অপহরণকারীদের গুলিতে ২৬ বাংলাদেশি নিহত ও ১১ জন আহত হন।

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com