সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৫০ অপরাহ্ন

রূপকথাকেও হার মানায় যে নারীর গল্প!

রূপকথাকেও হার মানায় যে নারীর গল্প!

গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার ছিলেন। এই নির্যাতনের মাঝে আবার গুরুদায়িত্ব নেমে আসে ঘাড়ে। বিয়ের এক বছরের মধ্যেই সন্তানের জন্ম দেন। তার দু’বছরের মধ্যে আরও এক সন্তানের মা হন তিনি।

কিন্তু বিবাহিত জীবন যত এগোচ্ছিল ততই গার্হস্থ্য সহিংসতাও বাড়ছিল তার ওপর। দুই সন্তানকে বড় করা, নিজেকে স্বামীর নির্যাতন থেকে রক্ষা করা সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

শেষমেশ কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। সংসার ত্যাগ করে মা-বাবার কাছে চলে যান। কিন্তু সেখানেও সমস্যার শেষ ছিল না। বাবার একার উপার্জনে সংসার চালানো ছিল অসম্ভব। শেষে উপার্জনের জন্য সন্তানদের মা-বাবার কাছে রেখে কিছু ঋণ করে পাড়ি দেন সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়।
মনে ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কিন্তু শুরু করেছিলেন একেবারে নীচের ধাপ থেকে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভর করেই ভাল ইংরাজি বলতে না পারা সেই নারী দরজায় দরজায় জিনিস বিক্রি করতে করতে এক দিন হয়ে উঠলেন নিউজিল্যান্ড পুলিশের অফিসার!

নিউজিল্যান্ড পুলিশের উচ্চপদে কর্মরত হিসেবে তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী। নিজের হাসিখুশি জীবনকে এক সময়ে ইতিহাস ভাবতে চলা তিনিই আজ বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন।

তার নাম মানদীপ কৌর। ভারতের পাঞ্জাবের এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম তার। ১৮ বছর বয়সেই বাবা-মা তার বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ের পরও জেদ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন মানদীপ। কিন্তু দিনের পর দিন স্বামীর অত্যাচার আর সইতে পারছিলেন না।

তার ওপর ১৯ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের মা হন তিনি। জীবন যেন আরও দূর্বিষহ হয়ে উঠেছিল তার কাছে। তাও মুখ বুজে সংসার সামলাচ্ছিলেন। কিন্তু সে সহ্যেরও সীমা ভাঙল একদিন।

সন্তানদের বয়স যখন ৬ এবং ৮ বছর, স্বামীর ঘর ছাড়েন মানদীপ। মা-বাবার কাছে চলে যান। কাজের খোঁজ শুরু করেন। এক পরিচিতের কথায় তিনি সন্তানদের ছেড়ে পাড়ি দেন অস্ট্রেলিয়ায়।

কোথায় থাকবেন, কী কাজ করবেন কিছুই জানা ছিল না। এত খোঁজ খবর নেওয়ার মতো মানসিক পরিস্থিতিও ছিল না তার। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।

সেখানে গিয়ে সেলসম্যানের কাজ পেয়ে যান। ঠিক মতো ইংরেজি বলতে পারতেন না। তাই যা বলতে চাইতেন সবটাই কাগজে লিখে নিয়ে যেতেন।

এরপর ১৯৯৯ সাল নাগাদ তিনি নিউজিল্যান্ডে চলে যান। সেখানে ট্যাক্সি চালাতে শুরু করেন তিনি। অকল্যান্ডের একটি লজে থাকতে শুরু করেন।

সেখানেই তার সঙ্গে জন পেগলার নামে এক ব্যক্তির পরিচয় হয়। লজের রিসেপশনে কাজ করতেন জন। তিনি ছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তন পুলিশ অফিসার। অবসরের পরে ওই লজে কাজ করতেন।

মানদীপের কাছে জন ছিলেন বাবার মতো। মানদীপের সঙ্গে সময় কাটানো, তার কষ্টের কাহিনি শোনা এবং কাজ থেকে ফিরলে এক কাপ গরম কফি করে দেওয়া, সবই করতেন জন।

জনের কাছে একবার পুলিশ হওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন মানদীপ। আর সেটাই ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।

সাঁতার শেখানো, দৌড়, নিজেকে ফিট করে তোলার সমস্ত অনুশীলন শুরু হয় তার। জন এবং তার পরিবার ক্রমাগত সাহায্য করতে থাকে মানদীপকে।

২০০২ সালে সন্তানদেরও নিউজিল্যান্ড নিয়ে যান তিনি। তার দু’বছর পর প্রথম পুলিশের পোশাক গায়ে জড়ান মানদীপ। কনস্টেবল হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল অফিসার হওয়ার। একাধিক বার পদোন্নতির চেষ্টা বিফল হয়। শেষমেশ একজন সিনিয়র সার্জেন্ট হিসেবে পদোন্নতি হয় তার। তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী যিনি নিউজিল্যান্ড পুলিশের উচ্চপদে কর্মরত।

মানদীপের বয়স এখন ৫২ বছর। তার সন্তানরাও বড় হয়ে গিয়েছেন। পাকাপাকিভাবে নিউজিল্যান্ডেই থাকেন তারা। এমনকি নাতিও হয়ে গিয়েছে তার। সূত্র: আনন্দবাজার

 

সময়ের ধারা নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com