সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন

পাতাল রেলে বিলাসিতা

পাতাল রেলে বিলাসিতা

যানজট নিরসনে রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এবার পাতাল রেল বা সাবওয়ে নির্মাণ করতে চায় সরকার। বলা হচ্ছে- সাবওয়ে হলে ঢাকা শহরের প্রায় ৮০ লাখ যাত্রীর ৪০ লাখ মানুষ মাটির নিচে স্থানান্তর হবে। মাটির উপরিভাগ যানজট ও জনজট থেকে মুক্ত থাকবে। প্রতি ৩০ কিলোমিটারে ৮ বিলিয়ন ডলার করে ব্যয় হবে- প্রাথমিকভাবে করা এই হিসাব ধরে ২৩৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণে ব্যয় পড়বে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরিকল্পনায় আছে ১১টি রুট। এর মধ্যে শুরুতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ৪টি রুটের। এসব রুটের করা নকশা অনুযায়ী ৯০ কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হবে ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ প্রকল্পের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ স্টেকহোল্ডাররা। তারা বলছেন, একটি সাবওয়ে লাইনে যে টাকা ব্যয় বলা হচ্ছে, তা দিয়ে একটি জেলা শহরকে বদলে দেওয়া যায়। নতুন শহর করা যায়।

ঢাকার যানজট নিরসনে কী কী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে তা ২০০৪ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বলা হয়েছে। ২০১৬ সালে সংশোধিত এসটিপিতে (আরএসটিপি) পাঁচটি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটি নির্মাণের সুপারিশ রয়েছে। আগের দুই মহাপরিকল্পনাতেই ঢাকার মতো অপরিকল্পিত শহর পাতাল রেল নেটওয়ার্কের উপযুক্ত নয় বলে মতামত এসেছিল। তারপরও কেনো সাবওয়ে? অংশীজনদের এ প্রশ্নে সচিব বেলায়েত হোসেন বলেছেন, আরএসটিপির সঙ্গে সমন্বয় করেই সাবওয়ে হবে। আরএসটিপি হালনাগাদ করা হচ্ছে। সেখানে সাবওয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে।

বিপুল অংকের এ প্রকল্প সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্বে নির্মাণের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। বিল্ড, ওন, অপারেট, ট্রান্সফার পদ্ধতিতে ঠিকাদার নিজের জোগাড়কৃত অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত পরিচালনার মাধ্যমে ব্যয় তুলে নেওয়ার পর সরকারের কাছে তা হস্তান্তর করবে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এ সংক্রান্ত সেমিনারে জানানো হয়েছে, চার বছর আগের এ পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিতে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক নকশা প্রণয়নের কাজ ৬৩ ভাগ শেষ হয়েছে। সেমিনারে ৩১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান ‘ঢাকা সাবওয়ে নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন’ প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয় স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনদের সামনে।

১১টি রুট পরিকল্পনায় থাকলেও চারটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি রুটগুলো পর্যায়ক্রমে ২০৭০ সালের মধ্যে নির্মাণ হবে। অগ্রাধিকারের চারটি রুট হলো, ‘লাইন ও’ টঙ্গী থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল ২৯ কিলোমিটার, ‘লাইন এস’ কেরানীগঞ্জ থেকে সোনাপুর ১৯ কিলোমিটার, ‘লাইন টি’ নারায়নগঞ্জ থেকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর ৩৫ কিলোমিটার এবং গাবতলী থেকে মাস্তুল ১৯ কিলোমিটার।

প্রকল্প পরিচালক কাজী মুহাম্মদ ফেরদৌস জানান, প্রতি ৩০ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণে আট বিলিয়ন ডলারের মতো ব্যয় হতে পারে, যা ৬৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ। মাটির ২০ থেকে ৩০ ফুট গভীরে আগামী ৫০ বছরে ১১ রুটে ২৩৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তাতে সর্বমোট কত ব্যয় হতে পারে তা পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষার আগে বলা সম্ভব নয়।

গতকাল সেমিনারের সভাপতি এবং সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেছেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বাজেট ছিল ১৪০ কোটি টাকা। এখন তা প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে। সাবওয়ের ক্ষেত্রে অর্থায়ন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

স্পেনের প্রতিষ্ঠান টেকনিকা ওয়াই প্রয়েক্টস এস এ’র (টিপসা) নেতৃত্বে জাপানের পাডেকো, বিসিএল এসোসিয়েটস্, কেএসসি এবং বেটস যৌথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ৯০ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে ২১৯ কোটি টাকার চুক্তি হয়। পরে তা ১৪৮ কিলোমিটার বাড়ে। চুক্তির ব্যয় বেড়ে হয় ৩১৮ কোটি টাকা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের নেটওয়ার্ক প্রস্তাবনা গত ১৫ মার্চ জমা দিয়েছে।

সেমিনারে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, যানজট নিরসনেই পাতাল রেলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাবওয়ে নির্মিত হলে ঢাকা শহরের প্রায় ৮০ লাখ যাত্রীর ৪০ লাখ মানুষ মাটির নিচে স্থানান্তর হবে। মাটির উপরিভাগ যানজট ও জনজট মুক্ত থাকবে।

মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন একই ধরনের প্রকল্পগুলোর সমন্বয় সাথে বাড়াতে হবে। নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। তা না হলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায় এবং সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ পড়ে।

ওবায়দুল কাদের সেমিনারে জানান, পদ্মা সেতুর কাজ ৯২ দশমিক ৫ ভাগ শেষ। আগামী বছরের জুনে সেতু চালু হবে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ বঙ্গবন্ধু সেতু টানেলের আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টিউবের রিং প্রতিস্থাপনসহ বোরিং কাজ শেষ হয়েছে। টিউবটির ২০০ মিটার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন মার্টিন থমাস, পেপ ল্যাফন্ড, ক্ল্যামেন্তে মাতা, জোয়ান টর এবং অ্যালেক্সেন্ডা ডেলগাডো। এরপর স্টেকহোল্ডাররা তাদের মতামত তুলে ধরেন। প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বলা হয়েছে সাবওয়ে নির্মাণের পর বাসে ৯৮ ভাগ যাত্রী পাতাল ট্রেনে চলে যাব। টঙ্গী থেকে ঝিলমিলের বাস ভাড়া ৫০ টাকা। কিন্তু সাবওয়ের যে উচ্চ ব্যয়, তা পোষাতে অন্তত ৪০০ টাকা ভাড়া নিতে হবে। এত টাকা দিয়ে যাত্রী উঠবে কিনা। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলছে। কিন্তু সব মেগা প্রকল্প যদি ঢাকাতেই হয়, তবে ঢাকায় জনজট আরও বাড়বে। একটি সাবওয়ে লাইনে যে টাকা খরচ হবে, তা দিয়ে একটি জেলা শহরকে বদলে দেওয়া যায়। নতুন শহর করা যায়।

 

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com