সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন

সেই ঈদযাত্রা সেই ভয়

সেই ঈদযাত্রা সেই ভয়

দেশে করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ এখন কিছুটা নিম্নমুখী। গত ৩৯ দিনের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বনিম্ন শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হারও নেমে এসেছে ১০ শতাংশের নিচে। সংক্রমণের এমন নিম্নমুখী প্রবণতাতেও ভরসা পাচ্ছেন না স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারণ, সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এ ঈদ উপলক্ষে গ্রামমুখী যাত্রাকে কেন্দ্র করেই তাদের যত ভয়। মুসলমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদের আগে লঞ্চ, ট্রেন ও বাসে গাদাগাদি করে বাড়িফেরার দৃশ্য খুবই পরিচিত। আর এ শারীরিক দূরত্বহীন যাত্রাই করোনা ভাইরাস ছড়ানোর ‘উর্বর’ ক্ষেত্র। ঘরমুখী মানুষের এই স্রোতে করোনা ভাইরাসেরও ‘ঢল’ নামে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত সবাই।

এমনিতে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ধরন প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাপক সংক্রমণ ক্ষমতার ওই ধরন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যেই পবিত্র ঈদ আসন্ন। ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন গবেষণায় এসব আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে জুন-জুলাইয়ে দেশে করোনার তৃতীয় ঢেউ দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। এ কারণে ঈদ সামনে রেখে মানুষের চলাচলে কড়াকড়ি আরোপের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত বছরের রোজার ঈদে মানুষকে ঢাকা ছাড়তে নিষেধ করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। এর পরও ঘরমুখী মানুষের ঢল নামে। এতে সংক্রমণের রাশ টেনে ধরা যায়নি। ফলে সংক্রমণ চূড়ায় পৌঁছায় জুন-জুলাইয়ে। ওই সময় পণ্যবাহী গাড়ির ছাদে চড়ে এমনকি ড্রামের ভেতরে লুকিয়ে বসে যাত্রার দৃশ্য এখনো চোখে ভেসে ওঠে। রড বহনকারী একটি ট্রাকে চড়ে যাওয়ার সময় ১৬ জনের একসঙ্গে প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোজার ঈদ সামনে রেখে ৫ মে’র পর বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হলে এবারও মানুষ বাড়ি যাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঈদে রাজধানী থেকে করোনা আক্রান্ত অনেকে বাড়ি গিয়ে গ্রামেও ভাইরাস ছড়াতে পারেন। করোনা ভাইরাসের আফ্রিকান ধরনটি খুবই সংক্রমণশীল। এতে সংক্রমণ কম থাকা গ্রামাঞ্চলেও করোনা ভাইরাসের বিস্তার বেড়ে যেতে পারে। বর্তমানে করোনার ধরন খুব দ্রুত ফুসফুসকে আক্রান্ত করছে, এ কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি।

দেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম তিনজন করোনা ভাইরাসের রোগী পাওয়া যায়। এর পর সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে জুন-জুলাইয়ে সর্বোচ্চ চূড়ায় (পিক) পৌঁছায়। ওই সময় দিনে চার হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হতো এবং মারা যান ৫০-৬০ জনের মতো। এর পর সেপ্টেম্বর থেকে সংক্রমণ কমতে শুরু করে এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রোগী ৩০০ জনের নিচে নেমে আসে। কিন্তু হঠাৎ মার্চের শুরু থেকে সংক্রমণ আবার বাড়তে থাকে এবং একদিনে রোগী শনাক্তের সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজারের বেশি এবং মৃত্যু ১০০ জনের বেশি হয়। সংক্রমণ প্রতিরোধে গত ৫ এপ্রিল থেকে কয়েক ধাপে চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করে সরকার। এটি চলবে ৫ মে পর্যন্ত।

এ বিধিনিষেধে অফিস-আদালত, গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। শুরুতে দোকানপাট বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি তা খুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারি সূত্র বলছে, ৫ মে’র পর গণপরিবহনও চালু হতে পারে। ঈদযাত্রা স্বাভাবিক করতে সরকার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছে। কিন্তু এর সঙ্গে চিন্তা বাড়াচ্ছে করোনা সংক্রমণের বিষয়টিও। গণপরিবহনে চলাচলে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, সরকারের বিধিনিষেধের কারণে করোনার সংক্রমণ কমছে। ৫ মে’র পর বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হলে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ঈদ উপলক্ষে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল শুরু করবে। অনেক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যাবে। তাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক করোনা রোগী থাকলে তারা সংক্রমণ গ্রামে নিয়ে যাবে। যারা সংক্রমিত হবেন তারা আবার অন্যদের সংক্রমণ করবেন। এর মধ্যে যদি করোনার ভারতীয় ধরনটি আসে, সেটি যেহেতু দ্রুত ছড়ায় তখন সেটিরও একটি প্রভাব পড়বে। আমরা মনে করি ঈদ ঘিরে বহু লোকের এই যাতায়াতে সংক্রমণ আবার বেড়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, সরকার যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সেটি ঈদ পর্যন্ত বহাল রাখা যায় তা হলে সংক্রমণের এখন যে নিম্নমুখী হার, তা বজায় থাকবে। আর বিধিনিষেধ একেবারেই তুলে দেওয়া হলে সংক্রমণ আবারও বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, বিধিনিষেধ আরোপের কারণে করোনার সংক্রমণ কমেছে। এখন যদি ঈদকে ঘিরে এটি তুলে দেওয়া হয় সংক্রমণ আবার বেড়ে যেতে পারে। যদি ঈদ উপলক্ষে যানবাহন চালু করা হয় তা হলে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর জন্য সম্পৃক্ত করতে হবে। অন্যথায় যে যার যার মতো চলবে। এতে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি আছে।

 

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com