বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৩২ পূর্বাহ্ন

কিছু ছাড়ের বিচ্ছিন্নতা

কিছু ছাড়ের বিচ্ছিন্নতা

করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় রাজধানী ঢাকাকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল ভোর থেকে দূরপাল্লার কোনো বাহন ঢাকার টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যায়নি। শহরে প্রবেশ করতেও পারেনি কোনো যাত্রীবাহী বাস। বন্ধ করে দেয় সরদঘাটের সঙ্গে অন্য জেলার নৌ যোগাযোগ। দিনভর কমলাপুর রেলস্টেশন ট্রেন চলাচল করলেও বিকালে সিদ্ধান্ত হয় বন্ধ করে দেওয়ার। কার্যকর হয়েছে গতকাল দিবাগত রাত ১২টার পর।

সব মিলিয়ে ঢাকাকে পরিবহন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে লকডাউন ঘোষণার প্রথম দিনে অবশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। বিকল্প বাহনে জরুরি কাজে ঠিকই গন্তব্য গেছেন যাত্রীরা। যাদের অফিস কাছাকাছি আবার যারা জানেন না সরকারি বিধিনিষেধের কথা সেসব মানুষকে চেকপয়েন্টে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয় গতকাল। এর আগের দিন ঢাকা বিভাগের সাত জেলায় নয় দিন জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব ধরনের কার্যক্রম ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। গতকাল সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর আশপাশের সাত জেলায় চলছে কঠোর বিধিনিষেধ। বন্ধ আছে দূরপাল্লার বাস চলাচল। গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকে কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি।

তবে যাতায়াতে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। একই অবস্থা ছিল সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। তবে কমলাপুর রেলস্টেশনে ছিল যাত্রীচাপ। যদিও আজ মধ্যরাত থেকে কমলাপুর থেকে রেল যোগাযোগ বন্ধ করার কথা। সব মিলিয়ে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের পরিবহন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হয়েছে। তবে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়নি।

সোমবার মন্ত্রিপরিষদের আদেশের পর বলা হয়, নির্দিষ্ট ৭ জেলার ওপর দিয়ে চলাচল করা কোনো ট্রেন থামবে না। মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জে এ বিধিনিষেধের আওতায় থাকবে। এই সাত জেলার মধ্যে মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর রেল নেটওয়ার্কে নেই। তবে গতকাল বিকালে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন আমাদের সময়কে জানান, মঙ্গলবার রাত ১২টার পর থেকে ঢাকা থেকে কোনো ট্রেন অন্য গন্তব্যে যাবে না। ঢাকার বাইরে থেকে কোনো ট্রেনও রাজধানীতে ঢুকতে পারবে না। কার্যত ঢাকার সঙ্গে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা জেলাগুলোর মধ্যে চলাচলকারী পাঁচটি ট্রেন গতকাল যাত্রা বাতিল করেছে। প্রথমে গতকাল থেকে আগামী ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত গাজীপুর জেলার মধ্যে চলাচলরত তুরাগ এক্সপ্রেস ও কালিয়াকৈর কমিউটার ট্রেন বাতিল করা হয়। এ ছাড়া গাজীপুরের সব স্টপেজ লকডাউন থাকা পর্যন্ত বাতিলের কথা বলা হয়, আন্তঃনগর ট্রেন থামবে না। তা ছাড়া গোপালগঞ্জ-রাজশাহীর মধ্যে চলাচলকারী টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, খুলনা-রাজবাড়ীর মধ্যে চলাচলকারী নকশিকাঁথা এক্সপ্রেস ও রাজবাড়ী-ভাঙ্গা-রাজবাড়ীর মধ্যে চলাচলকারী রাজবাড়ী এক্সপ্রেস বাতিল করা হয়েছে। তবে বিকালে সিদ্ধান্ত হয় ঢাকার সঙ্গে কোনো ট্রেন যোগাযোগ থাকবে না।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে সকাল ছয়টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত লঞ্চ, স্পিডবোট, ট্রলারসহ সব নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। ঢাকার চারপাশের জেলাগুলোসহ যে সাতটি জেলায় লকডাউন দেওয়া হয়েছে, সে জেলাগুলোর নৌ চলাচলসহ ঢাকা থেকে সারা দেশের নৌ চলাচল বন্ধ থাকবে। ফলে গতকাল থেকে ঢাকা-মাদারীপুর, ঢাকা-মিরকাদিম, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, শিমুলিয়া (মুন্সীগঞ্জ)-বাংলাবাজার (মাদারীপুর), মাঝিকান্দি (শরীয়তপুর), আরিচা (মানিকগঞ্জ)-কাজিরহাট, পাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)-দৌলতদিয়া (রাজবাড়ী) নৌপথে সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত চলাচল বন্ধ রাখার কথা জানায় বিআইডব্লিউটিএ। এ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দেশের অন্য জেলা থেকে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী নৌযান মাদারীপুর, পাটুরিয়া, দৌলতদিয়া, আরিচা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মিরকাদিম লঞ্চঘাটে ভিড়তে পারবে না। তবে পণ্য পরিবহন এবং জরুরি সেবা প্রদানকারী নৌযানের ক্ষেত্রে এ আদেশ কার্যকর হবে না।

গতকাল মঙ্গলবার ভোর ছয়টা থেকে এ নিষেধাজ্ঞা শুরু হলেও দক্ষিণাঞ্চলের অনেক যাত্রী বিষয়টি জানেন না। এ কারণে তারা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এসে ফিরে গেছেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় দক্ষিণাঞ্চলের বেশকিছু যাত্রী লঞ্চ না পেয়ে টার্মিনাল থেকে ফিরে যাচ্ছেন। বেশকিছু লঞ্চ সরিয়ে অন্যত্র নোঙর করা হয়েছে।

দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সার্বিক কার্যাবলি ও চলাচলের বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করায় রাজধানীর ব্যস্ততম বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদ থেকে কোনো ধরনের দূরপাল্লার যানবাহন ছাড়ছে না। হঠাৎ করে যানবাহন বন্ধ থাকার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। যাত্রাবাড়ী, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে কোনো দূরপাল্লার বাস ছাড়ছে না এবং কোনো দূরপাল্লার বাস ঢাকায় প্রবেশও করতে পারছে না। তবে যাদের অফিস ঢাকা মহানগরীর পার্শ্ববর্তী এলাকা নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারে তারা পড়েন বিপদে। অতিরিক্ত ভাড়ায় ভোগান্তি মেনে নিয়ে গন্তব্য পাড়ি দেন এসব যাত্রী। আর সোমবারের সরকারি নির্দেশনা জানতে না পারা যাত্রীরা টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাহন না পেয়ে ফিরে যান বাসায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ দিকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে রাজধানীকে অবরুদ্ধ করে ফেলায় দূরপাল্লার কোনো যানবাহন ঢুকতে পারছে না। গতকাল সকাল থেকে ঢাকার প্রবেশপথগুলোয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে শত শত গাড়ি আটকে আছে; তৈরি হয়েছে ব্যাপক যানজট।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মুনিবুর রহমান বলেন, লকডাউনের কারণে অন্য জেলা থেকে আসা গণপরিবহনগুলোকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের ঢাকায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

ঢাকার প্রবেশমুখে যানজটে আটকা পড়ার বিষয়টি অনেকেই ফেসবুকের পরিবহন ও ট্রাফিক পাবলিক গ্রুপগুলোয় জানাচ্ছেন। কেউ আটকা পড়েছেন কুমিল্লার দাউদকান্দিতে, কেউবা নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন ব্রিজের গোড়ায়। বাধ্য হয়ে অনেকেই হেঁটে রওনা হয়েছেন গন্তব্যে। এ নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, যে জেলাগুলোয় লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে সে জেলাগুলোর ওপর দিয়ে আসা কোনো যাত্রীবাহী পরিবহন ঢাকায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তাই যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যা বলেন, যে জেলাগুলোয় লকডাউন দেওয়া হয়েছে, ঢাকা থেকে বের হতে হলে এগুলোর ওপর দিয়েই যেতে হবে। এ কারণে সব দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ আছে।

 

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com