বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৭:১৮ পূর্বাহ্ন

মগবাজারে বিস্ফোরণ নেপথ্যে গ্যাসলাইন

মগবাজারে বিস্ফোরণ নেপথ্যে গ্যাসলাইন

বিশেষ প্রতিনিধি  সোমবার দুপুরে নিজ দোকানে পড়ে থাকা সব ভাঙা কাচ সরাচ্ছিলেন অমল চন্দ্র শীল। হেয়ারক্রাফট নামে একটি সেলুন রয়েছে তার। মগবাজারে আড়ংয়ের উল্টো পাশে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত তিনতলা ভবনের ঠিক পেছনে অমলের সেই সেলুন। গতকালও তার চোখে-মুখে আতঙ্ক। তিনি বলেন, ‘ধুম করে শব্দ হওয়ার পরপরই কাচ ভেঙে মাথার ওপর পড়ছিল। দ্রুত চেয়ারের নিচে মাথা লুকাই। পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি অনেক মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় এদিক-সেদিক পড়ে আছে।’
হঠাৎ বিস্ফোরণের পর গতকালও মগবাজার ও আশপাশ এলাকার বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের ঘোর কাটেনি। দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির কাচ, দরজা-জানালা ভেঙে চুরমার। মূল ঘটনাস্থলের চারপাশে অন্তত এক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্ম্ফোরণের শব্দ ও এর প্রতিক্রিয়ায় ক্ষয়ক্ষতি হয়। কীভাবে, কেন তীব্র এই বিস্ফোরণ- এমন প্রশ্ন সবার মাঝে। অনেকে তিতাসের লাইনকে সন্দেহের তালিকায় রাখছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোমা নিষ্ফ্ক্রিয়করণ দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে (লিকেজ) বিস্ম্ফোরণের সূত্রপাত। গ্যাস জমে জমে ভবনের ভেতরের কোনো কক্ষে ‘গ্যাস চেম্বার’ তৈরি হয়। এরপর কোনো সিগারেট বা অন্য কোনো মাধ্যমে আগুনের সংযোগের পর তা বিকট শব্দে বিস্ম্ফোরিত হয়।
প্রতিবেদনে এটিকে প্রাকৃতিক গ্যাস, মিথেন বা হাইড্রোকার্বন গ্যাসের বিস্ফোরণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসি বা এ ধরনের কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের বিস্ম্ফোরণে সাধারণত এত বিকট শব্দ হওয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণেও এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না। আর একই সময় একাধিক সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও ঘটেনি। ভবনের ভেতর থেকে অক্ষত অবস্থায় গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া গেছে। তবে ভবনে বাতাস চলাচল ব্যবস্থা (ভেন্টিলেশন) থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হতো।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে তিন ধরনের গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েছি। তা হলো- মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড ও ফসজিন। ধারণা করছি, এতগুলো গ্যাস একসঙ্গে মিশে যাওয়ায় ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটেছে। তিতাসের লাইনে মিথেন গ্যাস থাকে। স্যুয়ারেজ লাইনে হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া যায়। ফসজিন এমন গ্যাস, তা নিজের একার খুব বড় ক্ষতির কারণ হওয়ার ক্ষমতা নেই। তবে অন্য গ্যাসের সঙ্গে মিশে সেটিও ভীতিকর হতে পারে। তিতাস বলছে, ওই ভবনে তাদের বৈধ লাইন নেই। তবে ঢাকায় এমন অনেক জায়গায় গ্যাসের লাইন থাকে, যা তিতাস নিজেও জানে না। সেখানে গ্যাসের লাইন ছিল কি-না এটা আমরা পরীক্ষা করে দেখব।
সাজ্জাদ হোসাইন আরও বলেন, বিধ্বস্ত ভবনের সামনে খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছিল। এতে তিতাসের লাইন কাটা পড়তেও পারে। এ ছাড়া সিসিটিভির ফুটেজে দুর্ঘটনার পর আগুনের স্ম্ফুলিঙ্গ ছড়াতে দেখা গেছে। যতক্ষণ গ্যাস ছিল ততক্ষণ আগুন জ্বলেছে।
গতকাল সোমবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, বোমা হামলা মনে করে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। এখানে একমুখী ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। যদি বিস্ম্ফোরক হতো, তাহলে বহুদিকে, মানে তিন-চারদিকে যেত। তা ছাড়া এ ঘটনায় কাচের টুকরা ছাড়া আমরা অন্য কিছু পাইনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও সেফটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে ৮-৯ শতাংশ মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাছাড়া ঢাকায় তিতাস ও স্যুয়ারেজের লাইন অনেক পুরোনো। সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায় স্বীকার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা না হলে নারায়ণগঞ্জের তল্লা ও মগবাজারের মতো এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আরও হবে।
এমন ভয়াবহ বিস্ম্ফোরণ অব্যবস্থাপনা বা অনিয়মের কারণে ঘটছে বলে মনে করেন কিনা- জানতে চাইলে আলী আহাম্মেদ খান বলেন, সারাদেশেই উন্নয়নের কাজ চলছে। এসব কাজে অনেক ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড বা নির্মাণকাজে ফায়ার নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। যে কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
তবে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মো. নুরুল্লাহর ভাষ্য, ওই ভবনে তিতাসের বৈধ-অবৈধ কোনো সংযোগ নেই। এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণের কারণে এটা ঘটতে পারে। এলপিজি সিলিন্ডারের কথা কেউ বলছে না কেন? সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণে এত বড় দুর্ঘটনার নজির বিদেশে রয়েছে। আর ঘটনাস্থলে মিথেন গ্যাসের যে অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, সেটা স্যুয়ারেজ লাইনের হতে পারে। এ দুর্ঘটনার জন্য তিতাস দায়ী নয়।

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com