বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:১৫ অপরাহ্ন

রাজারবাগ পীরের ‘মামলা সিন্ডিকেট’

রাজারবাগ পীরের ‘মামলা সিন্ডিকেট’

রাজারবাগ দরবার শরিফের পীরের নেতৃত্বে হয়রানিমূলক ‘মামলার সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এমনই একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ প্রতিবেদনের ওপর আগামী ১২ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন দার্য করা হয়েছে।

জানা গেছে, রাজধানীর শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, মানবপাচারসহ অন্যান্য অভিযোগে ৪৯ মামলা করা হয়। অপরাধ না করেও এসব মিথ্যা মামলার আসামি হওয়া থেকে বাঁচতে তিনি হাইকোর্টের দারস্থ হন। তার করা রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে মামলার বাদীদের খুঁজে বের করতে গত ১৪ জুন সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রতন কৃষ্ণনাথ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- রিট আবেদনকারীর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৪৯ মামলা ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় করা হয়েছে। এর মধ্যে জিআর মামলা ২৩ এবং সিআর মামলা ২৬টি। ইতোমধ্যে জিআর ১৫ মামলা এবং সিআর ২০টি মামলায় আবেদনকারী আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন। বর্তমানে ১৪টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৮ জিআর এবং ৬টি সিআর মামলা রয়েছে। রিট পিটিশনে পক্ষভুক্ত ২০ ব্যক্তি আদালতে বাদীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা করেছেন। তাদের ছাড়াও আরও একাধিক ব্যক্তির তথ্য পাওয়া গেছে, যারা আবেদনকারীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক একাধিক মামলার বাদী ও সাক্ষীর ভূমিকা পালন করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো সম্পর্কে প্রকাশ্য ও গোপনে অনুসন্ধান করে জানা যায়, অধিকাংশ মামলার বাদী, সাক্ষী, ভুক্তভোগীরা কোনো না কোনোভাবে রাজারবাগ দরবার শরিফ এবং ওই দরবার শরিফের পীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর দিল্লুর রহমান তার মুরিদ ও অনুসারীদের দিয়ে মামলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন প্রকার হয়রানির বিষয়ে ২০২০ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অভিযোগ পেয়ে একটি তদন্ত পরিচালনা করে বলেও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।

মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর দিল্লুর রহমান ও তার অনুসারীরা তাদের দরবার শরিফের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য নিরীহ জনসাধারণের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করে আসছে। ওই প্রতিবেদনে একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর সিন্ডিকেটের করা হয়রানিমূলক মামলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া সংবাদপত্র ও টিভি মিডিয়ায়ও বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আকারে প্রচার হয়েছে বলে সিআইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রিট আবেদনে পক্ষভুক্ত ব্যক্তিরা এবং তদন্তকালে পাওয়া ব্যক্তিরাই কাঞ্চনের বিরুদ্ধে করা মামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর দিল্লুর রহমানের অনুসারী এবং মুরিদ হিসাবে তথ্যপ্রমাণে প্রতীয়মান হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।

সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, একরামুল আহসান কাঞ্চনের তিন ভাই এবং এক বোন। ১৯৯৫ সালে তার বাবা ডা. আনোয়ারুল্লাহ মারা যান। রাজারবাগ দরবার শরিফের পেছনে ৩ শতাংশ জমির ওপর তিনতলা পৈতৃক বাড়ি তাদের। বাবার মৃত্যুর পর কাঞ্চনের বড় ভাই আক্তার-ই-কামাল, মা কোমরের নেহার ও বোন ফাতেমা আক্তার পীর দিল্লুর রহমানের মুরিদ হন। কিন্তু রিট আবেদনকারী ও তার অপর ভাই ডা. কামরুল আহসান বাদলকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করেও ওই পীরের মুরিদ করা যায়নি। এরই মধ্যে রিট আবেদনকারীর মা, ভাই ও বোনের কাছ থেকে তাদের পৈতৃক জমির অধিকাংশই পীরের দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করা হয়। আবেদনকারী ও তার ভাইয়ের প্রাপ্য অংশটুকু পীর এবং তার দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করার জন্য ওই দুই ভাইয়ের ওপর দরবার শরিফের পীর দিল্লুর এবং তার অনুসারীরা বিভিন্নভাবে চাপ দিয়ে আসছিল। কিন্তু তারা সম্পত্তি হস্তান্তর না করায় পীর দিল্লুর রহমান ও তার অনুসারীদের সঙ্গে আবেদনকারীর শত্রুতা সৃষ্টি হয়। শত্রুতার কারণেই আবেদনকারীর বিরুদ্ধে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় এসব হয়রানিমূলক মামলা করে পীর দিল্লুর রহমান এবং তার অনুসারীরা। সিআইডির ওই তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মামলাগুলো দায়েরের পেছনে রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর দিল্লুর রহমান এবং ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অনুসারী তাদের অশুভ স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। তদন্তে উঠে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আদালতের নির্দেশনা প্রার্থনা জানিয়েছে সিআইডি।

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com