শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৩:২১ অপরাহ্ন

ডেসটিনির ৪৫ লাখ গ্রাহক টাকা ফেরত পাননি

ডেসটিনির ৪৫ লাখ গ্রাহক টাকা ফেরত পাননি

বিতর্কিত বহুস্তর বিপণন (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি/ এমএলএম) পদ্ধতির ব্যবসায়ের নাম করে এক যুগ ধরে মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছিল ডেসটিনি। ২০১২ সালে ধরা পড়ার পর কেটে যায় আরও ৯ বছর। অথচ প্রতিষ্ঠানটির ৪৫ লাখ গ্রাহকের কেউই আজও কোনো টাকা ফেরত পাননি। অন্যদিকে অর্থপাচার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি এবং ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে করা দুই মামলার বিচার শেষ হয়নি দীর্ঘ নয় বছরেও। আবার বিচারের সাথে গ্রহকের টাকা ফেরতের বিষয়টিও জড়িত নয়। ফলে গ্রহকরা কবে টাকা ফিরে পাবেন বা আদৌ পাবেন কিনা তা নিশ্চিত নয়।

ডেসটিনি, যুবক, ইউনিটুপেইউ, ইভ্যালি, এহসান গ্রুপ, ই-অরেঞ্জসহ প্রতারক কোম্পানিগুলো যারা গ্রহাকের টাকা মেরে দিয়েছে, তাদের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয় দুদকের আইনজীবী বিশেষ পিপি মীর আহম্মেদ আলী সালামের কাছে। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, গ্রহকের টাকা ফিরে পাওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। কারণ প্রতারণা করে নেওয়া টাকা তো কোম্পানিগুলোর কাছে নেই। তাদের ফান্ডে একেবারে নগণ্য টাকা রয়েছে। এজন্য অন্যান্য সম্পদও জব্দ করা হয়েছে। সব সম্পদ ও ফান্ডে থাকা টাকা দিয়েও গ্রহকের পাওনা সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ পাওনা টাকার পরিমাণ জব্দকৃত টাকা-সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি।

তিনি আরও বলেন, এসব কোম্পানি কীভাবে প্রতারণা করেছে, তার ডকুমেন্টস আমরা আদালতে দাখিল করেছি। তবে কোন গ্রহক কত টাকা পাবেন তার তালিকা আমাদের কাছে নেই। আবার কোনো গ্রাহক এসে তার পাওনা দাবিও করছে না। এজন্য আমরা কোম্পানিগুলো কত টাকা লুটপাট করে নিয়ে গেছে, কত টাকা মানিলন্ডারিং করেছে, সেটার তথ্য-প্রমাণ আদালতে দাখিল করেছি। আদালতের কাছে মানিলন্ডারিংয়ের যে সাজা জড়িতদের সেই সাজা দেওয়া হোক এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় খাতে দেওয়া হোক- সেই দাবি করছি। বিচারের পর কোম্পানিগুলোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় খাতে দেওয়া হবে। তখন ভুক্তভোগিরা কীভাবে রাষ্ট্রের কাছ থেকে তাদের পাওনা আদায় করবেন, সেটি রাষ্ট্রের সাথে গ্রাহকদের বোঝাপড়ার বিষয়।

মিথ্যা গুণাবলি বর্ণনা করে নিম্নমানের পণ্য এমএলএম পদ্ধতিতে অস্বাভাবিক উচ্চ দামে বিক্রি করা ছিল ডেসটিনির কাজ। ছাত্র, যুবক, গৃহিণী, বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও কলেজশিক্ষকরা ছিলেন ডেসটিনির মূল গ্রাহক। এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা করেই ডেসটিনি দাঁড় করায় ছোট-বড় ৩৪টি কোম্পানি। এর মধ্যে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড, ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন এবং ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি- এ তিনটির মাধ্যমেই বেশি টাকা আত্মসাৎ করেন ডেসটিনি গ্রুপের কর্তাব্যক্তিরা। ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব) হারুন-অর-রশীদ, এমডি রফিকুল আমীন এবং গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইনসহ ৫৩ জনের বিরুদ্ধে দুটি আলাদা মামলা করে দুদক।

মামলার এজাহারে বলা হয়, গ্রুপের ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন নামের কোম্পানিটি ৮১ লাখ গাছ লাগানোর কথা বলে মোট ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা গাছের বিপরীতে সংগ্রহ করলেও বাকি ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয় গাছ না লাগিয়েই। ২০০৬-০৯ সময়ে তারা এ ঘটনা ঘটায়। এ ছাড়া নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ চুক্তি অনুযায়ী ট্রি প্ল্যান্টেশনের কমিশন বাবদ ১ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা সরিয়ে নেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। আবার ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের (ডিএমসিএসএল) মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। অভিযুক্তরা মানুষের কাছ থেকে ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন এবং সেখান থেকে লভ্যাংশ, সম্মানী ও বেতন-ভাতার নামে ১ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা সরিয়ে নেন। দুই বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত শেষে দুদক মামলার অভিযোগপত্র দেয় ২০১৪ সালের ৫ মে। মামলা দুটির বিচার আজও শেষ হয়নি।

মামলার আসামিদের মধ্যে হারুন-অর-রশীদ অবশ্য ডেসটিনির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগের শর্তে ২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর থেকে জামিনে রয়েছেন। রফিকুল আমীন এবং মোহাম্মদ হোসাইন আজও ছাড়া পাননি। ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের আদেশে বলা হয়েছিলÑ যদি ছয় সপ্তাহের মধ্যে ৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা অথবা নগদ আড়াই হাজার কোটি টাকা সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়, তা হলে তারা জামিন পাবেন। ওই আদেশ এখনো বহাল থাকলেও কোনো টাকা সরকারের কোষাগারে জমা পড়েনি। কারণ বান্দরবান এলাকায় যে গাছ রয়েছে, তা বিক্রি করলে কোনোভাবেই ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা হবে না। আর এজন্য তাদের জামিনও মিলছে না। অন্য আসামিদের মধ্যে অনেকেই জামিনে, আবার অনেকেই পলাতক।

আদালতের নির্দেশে ২০১৩ সাল থেকেই ডেসটিনির নামে থাকা বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব পুলিশের। অর্থাৎ- ডেসটিনির সম্পদের রিসিভার বা তত্ত্বাবধায়ক পুলিশ। রায়ের পর এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে পারে রাষ্ট্রীয় অনুকূলে। রাজধানীতে থাকা ডেসটিনির সম্পদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং রাজধানীর বাইরের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ডেসটিনির কর্তাব্যক্তিরা কথিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নিজেদের নামেও বিপুল সম্পদ কিনেছেন। এগুলোর মধ্যে বাড়ি, গাড়ি, সিনেমাহল ছাড়াও রয়েছে পাটকল, হিমাগার, টেলিভিশন চ্যানেল ও ধানি জমি। তবে ডেসটিনির সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে ডিএমপির একটি কমিটি রয়েছে- ‘ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি-২০০০ লি. নামের কোম্পানির ক্রোককৃত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি সংক্রান্ত আহ্বায়ক কমিটি।’

ঢাকাসহ দেশের ২২টি জেলায় ডেসটিনির সম্পদ রয়েছে। এ সম্পদ দুই ভাগে বিভক্ত প্রতিষ্ঠানের নামে ও পরিচালকদের নামে। ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি, ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন এবং ডেসটিনি গ্রুপের এমডি মো. রফিকুল আমীন, ডেসটিনি ২০০০-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইনসহ পরিচালকদের নামে এগুলো কেনা। রাজধানীর বাইরে মুন্সীগঞ্জ জেলায় রয়েছে সবচেয়ে বেশি সম্পদ। এদিকে ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনেরই ২৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে। পুরান ঢাকার ২৫ নম্বর কোর্ট হাউস স্ট্রিট ভবন ও ধানমন্ডিতে রফিকুল আমীনের স্ত্রী ফারাহ দীবার নামে। ঢাকার কল্যাণপুরের দারুস সালাম ও পুরানা পল্টন লাইনের স্থাপনাবিহীন বাড়ি এবং বাংলামোটরে নাসির ট্রেড সেন্টারের ১০ম তলায় রয়েছে পাঁচ হাজার বর্গফুটের ফ্লোর। ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইনের নামে সিদ্ধেশ্বরী, খিলগাঁও, গেন্ডারিয়া, ক্যান্টনমেন্ট ও ভাটারায় প্লট-ফ্ল্যাট রয়েছে।

এ ছাড়া বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে রয়েছে ২৪টি রবার বাগান। খুলনায় সাত একর জমি, ছয় বিভাগীয় শহরে ডেসটিনি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সেন্টার নির্মাণের জমি, কক্সবাজারে জমিসহ নির্মীয়মাণ হোটেল ও গাজীপুরে ডেসটিনি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ স্থাপনের জন্য জমি রয়েছে। বান্দরবানের লামা থানায় রয়েছে ডেসটিনির সবচেয়ে বেশি রবার বাগান।

 

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com