রবিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২, ১২:৫৭ অপরাহ্ন

অতিমারী ডায়াবেটিস সুস্থ থাকতে করণীয়

অতিমারী ডায়াবেটিস সুস্থ থাকতে করণীয়

ডায়াবেটিস এক মারাত্মক ব্যাধি। পৃথিবীজুড়ে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর পরিমাণ মোটেও কম নয়। আমাদের দেশেও প্রায় ঘরে রয়েছে এ রোগে আক্রান্ত রোগী। এখনো বিশ্বের ৫০ ভাগ মানুষ জানেন না, তারা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত কিনা। বেশিরভাগ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত দেশের মানুষ এখনো ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় অসচেতন। তাদের হাতের নাগালের বাইরে চিকিৎসার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশে ২০১৯ সালের জরিপে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৫ লাখ। সে হিসেবে ২০৪৮ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াবে দেড় কোটি। এর মধ্যে অর্ধেক ডায়াবেটিস রোগী চিকিৎসা-সুবিধা পায় না। ডায়াবেটিস জটিলতায় ভুগছেন প্রায় ৬০ শতাংশ রোগী এবং এ রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে মোট আয়ের ১০ ভাগ।

মানবদেহে অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন হরমোন শরীরের সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কোনো কারণে ইনসুলিন উৎপাদন কমে গেলে বা ত্রুটিপূর্ণ ইনসুলিন তৈরি হলে কিংবা শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনে সাড়া না দিলেই বিপত্তি। রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়। খালি পেটে এ মাত্রা যদি ৭ মিলিমোল/লি. বা তার বেশি থাকে। ধরে নিতে হবে, শরীর ডায়াবেটিসের দিকে ঝুঁকছে। রোগীর ঘন ঘন পিপাসা, অতিরিক্ত ক্ষুধামান্দ্য , ঘন ঘন প্রস্রাব ও শরীরের ওজন কমে যেতে পারে। চোখে ঝাপসা দেখা, কাটাছেঁড়া সহজে না শুকানো বা অবশ বোধ করাও এ রোগের অন্যতম লক্ষণ। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ জন্মসূত্রে এ রোগপ্রাপ্ত হতে পারে। বাকি ৯০ শতাংশ অসচেতন জীবনযাত্রার প্রভাবে হয়ে থাকে। শুধু স্থূলতা, শরীরচর্চার অভাব, খাবার দাবারে নিয়ন্ত্রণহীনতা, মানসিক দুশ্চিন্তা বা চাপ- এ রোগের প্রধান কারণ। জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ রোগের ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ- হৃদপিন্ড, চোখ, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তনালিসহ নানা অঙ্গের ক্ষতি সাধন করে। ডায়াবেটিসের কারণে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করে। রক্ত চলাচল ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শরীরের নিম্নাঙ্গ পচন রোগে আক্রান্ত হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পা কেটে পঙ্গুত্ব বরণ করে। দীর্ঘদিন চোখের রক্তনালিতে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রোগী অন্ধত্ব বরণ করে। কিডনির কর্মহীনতার অন্যতম কারণও এই ডায়াবেটিস। ঐতিহাসিকভাবে ডায়াবেটিস পৃথিবীর অন্যতম পুরনো ব্যাধি। খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০ সালে মিসরে এ রোগের বর্ণনা পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের আয়ুর্বেদশাস্ত্রে, ২০০ খ্রিস্টাব্দে গ্রিক সভ্যতায় ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র শব্দগুলো ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ৬০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘মধুমেহ’ নামে যে ব্যাধির বর্ণনা পাওয়া যায়, তা ডায়াবেটিসেরই নামান্তর। বাংলাদেশে করোনায় ৭৫ ভাগ মৃত্যুর জন্য ডায়াবেটিস অনুঘটক হিসেবে কাজ করে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া করোনা আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীর উপসর্গে তীব্রতা, হাসপাতালে যাওয়া, আইসিইউ ব্যবহার, সংক্রমণ বৃদ্ধি, আক্রমণে তীব্রতা- সর্বোপরি মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর করতে করোনা অতিমারির সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে ডায়াবেটিস। এ ঘাতক রোগ করোনা রোগীর শর্করা পরিপাক, প্রদাহ, প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস ও ইলেক্ট্রলাইটসের ভারসাম্য নষ্ট করে শরীরের বিভিন্ন তন্ত্র অকার্যকর করে তোলে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের অতিরিক্ত সুগার করোনা সংক্রমনের গতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তাই ডায়াবেটিস অতিমারী রুখতে সবার সচেতন হওয়া জরুরি। জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে, স্থূলতা কমাতে হবে, শরীরচর্চা বৃদ্ধিসহ মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে হবে। তবেই এ রোগ থেকে আমরা মুক্ত থকতে পারব।

 

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com