শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০১:৪৬ অপরাহ্ন

সাইবার অপরাধের বেশি শিকার নারী প্রতিকারের ব্যবস্থা কী

সাইবার অপরাধের বেশি শিকার নারী প্রতিকারের ব্যবস্থা কী

যুগ যুগ ধরে চলে আসা বড় ধরনের এক সামাজিক সমস্যার নাম ‘বুলিং’। সাধারণভাবে অপ্রত্যাশিত ও আক্রমণাত্মক আচরণকে বুলিং বলা হয়। ক্ষতি করার ইচ্ছা নিয়ে কাউকে উৎপীড়ন করাও বুলিং। ওই উৎপীড়ন হতে পারে শারীরিক বা মানসিক। শারীরিকগুলো হচ্ছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারও গায়ে হাত দেওয়া, ধাক্কা মারা, লাথি মারা, ফেলে দেওয়া ইত্যাদি। আর কটু কথা বলা, ভয় দেখানো, কটাক্ষ করা ইত্যাদি মানসিক উৎপীড়নের মধ্যে পড়ে। গবেষণায় উঠে এসেছে, বুলিংয়ের শিকার হওয়া ব্যক্তি ভীতু, লাজুক, আত্মমুখী, অসুখী ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে থাকেন। তাদের সাধারণত বন্ধুবান্ধবও কম থাকে।

এ তো গেল সাধারণ বুলিংয়ের কথা। এখন সাইবার বা ইন্টারনেটের যুগ। তাই ইন্টারনেটকে ব্যবহার করে একশ্রেণির বিকৃত মানুষ সাইবার বুলিং করে যাচ্ছে। সাইবার স্পেসে একজনের ছবি বা ভিডিও বিকৃতি করে অনলাইনে তুলে ধরা হচ্ছে। চালানো হচ্ছে অপপ্রচার। এই হচ্ছে সাইবার বুলিং। এটি এক ধরনের সাইবার অপরাধ। এই অপরাধ প্রতিকারে আইন রয়েছে। অজ্ঞতা বা সচেতনতার অভাবে অনেকেই আইনের আশ্রয়ে আসেন না।

বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রযুক্তি প্রসারের এ যুগে ইন্টারনেট ছাড়া দুনিয়া চলে না। করোনার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে অফিস, কেনাকাটা অনলাইননির্ভর হয়ে পড়েছে আমাদের চোখের সামনেই। সুবিধার বিপরীত দিকও আছে। বেড়েছে হয়রানিও। এর শিকার হচ্ছেন নারীরাই বেশি। পরিসংখ্যান সেটিই বলছে। সাইবার অপরাধ ও প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজে নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন। সাইবার অপরাধ নিয়ে সংস্থাটি সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উঠে আসে, সাইবার অপরাধের শিকার নারী ৫৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বাকি ৪৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ ভুক্তভোগী পুরুষ। নারীরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে হয়রানি, এমনকি পর্নোগ্রাফিরও শিকার হয়েছেন।

এক-দুটি উদাহরণ দেওয়া যায়- একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন প্রেম করে বিয়ে করেন। বরপক্ষের অনেকেই এতে রাজি ছিল না। বিয়ের এক বছরের মাথায় স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় ওই মেয়ের। একপর্যায়ে ছেলেপক্ষের আত্মীয়স্বজন তার মোবাইল ফোন থেকে কতিপয় ব্যক্তিগত ছবি চুরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ওই মেয়ের জীবন এতটাই বিষিয়ে তোলা হয় যে, তখন তার ক্লাসে যাওয়াও দুরূহ হয়ে পড়ে। কেননা তার ছবি তখন ক্লাসের সবার হাতে হাতে। শক্তগোছের মানুষ হলেও মানসিক এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে তার। তবে এর মধ্যেই ক্ষতি হয়ে যায় ওই মেয়ের ক্যারিয়ারের। এ তো গেল এক ধরনের ঘটনা।

সরকারি একটি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রীর অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। ভুয়া ফেসবুক আইডির অত্যাচারে তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। এলাকার এক বখাটে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল তাকে। রাজি না হওয়ায় তার নামে ফেসবুকে চারটি আইডি খোলে ওই বখাটে। শুধু তা নয়, এ আইডিগুলো ব্যবহার করে সে ওই মেয়ের অশ্লীল ছবি ছড়ানো শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ওই ভুক্তভোগী তার অভিভাবকের সহায়তায় আইনের আশ্রয় নেন।

এমন অনেক ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে আমাদের চারপাশে। সম্মান হারাচ্ছে নির্দোষ মানুষ। সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন অনেকে। অথচ একটা সময় ছিল- যখন তারা এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতেন না, নীরবে সহ্য করতেন। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সাইবার বুলিজমে আক্রান্ত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে নিয়ে মানহানিকর বা বিভ্রান্তিমূলক কিছু পোস্ট করলে, ছবি কিংবা ভিডিও আপলোড করলে, কারও নামে অ্যাকাউন্ট খুলে বিভ্রান্তমূলক পোস্ট দিলে, কোনো স্ট্যাটাস দিলে, এমনকি শেয়ার অথবা লাইক দিলেও সাইবার অপরাধ হতে পারে। কাউকে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে হুমকি দিলে, অশালীন কোনো কিছু পাঠালে কিংবা দেশবিরোধী কোনো কিছু করলে তা সাইবার অপরাধ হবে। আবার ইলেকট্রনিক মাধ্যমে হ্যাক করলে, ভাইরাস ছড়ালে কিংবা কোনো সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ করলে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া অনলাইনে যে কোনো অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত হলে তাও সাইবার অপরাধ।

এ বছরেরই মে মাসের ঘটনা। হঠাৎ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন নারী ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার, খেলাবিষয়ক উপস্থাপক ও অভিনয়শিল্পী মিশু চৌধুরী। তার একটি ছবির নিচে একের পর এক কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য জমা হতে থাকে। এত ভয়াবহ সব মন্তব্য আসছিল যে, এতে যে কোনো মানুষই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে দুর্বলচিত্তের যে কোনো মানুষের এতে আত্মহত্যার প্রবণতা হতে পারে। মিশু চৌধুরী মানসিকভাবে শক্ত ছিলেন। ফলে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে গিয়ে তিনি সহযোগিতা পেয়েছিলেন।

মূলত অনেকেই জানেন না, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে কী করতে হবে। এ কারণে এ অপরাধটি আরও বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের অনেক বিভাগ সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করছে। নারীদের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ গত বছরের ১৬ নভেম্বর ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের কাছ থেকে ভালো কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এখানে এ পর্যন্ত অর্থাৎ গত ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ১৭ হাজার ২৮০ জন অভিযোগ করেছেন। তাদের মধ্যে আছেন ১২ হাজার ৬৮১ নারী। অভিযোগের ভিত্তিতে ৮ হাজার ২২১ জনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও দেওয়া হয়েছে।

 

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com