শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০২:৫৬ অপরাহ্ন

সাউথইস্ট ব্যাংক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করেছেন সাধারণ আমানতকারীগণ

সাউথইস্ট ব্যাংক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করেছেন সাধারণ আমানতকারীগণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ আমানতকারীগণ। তার ‘স্বেচ্ছাচারিতা, হরিলুট, জালিয়াতি, ব্যাপক দুর্নীতি এবং বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার’র হাত থেকে ব্যাংকটি রক্ষার জন্য দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন সকল আমানতকারীদের পক্ষে মো: আজিজুর রহমান আজাদ নামে এক আমানতকারী। ১৫ নভেম্বর ২০২১ ইং সোমবার সাধারণ আমানতকারীগনের পক্ষে দুদক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন শেষে ওই আমানতকারী দুদক চেয়ারম্যানের কাছে স্বারক লিপি জমা দেন। আমানতকারীর দাবি, সৌদি আরব প্রবাসী আলমগীর ছিলেন ব্যাংকটির সাধারণ শেয়ারহোল্ডার। সময়ের ব্যবধানে সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান বনে গেছেন তিনি। ধীরে ধীরে ছেলে রাইয়ান কবিরসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি চক্র, যার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের ব্যাংকটিকে লুটেপুটে খাচ্ছেন।
স্বারক লিপিতে উল্লেখ করা হয়, ‘জালিয়াতি, দুর্নীতি ও কারসাজির মাধ্যমে সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলমগীর কবির বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেছেন। তিনি কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং দুবাইতে অর্থপাচার করেছেন। পাচার করা অর্থে এসব দেশের অভিজাত এলাকায় গড়ে তুলেছেন বাড়ি। দুবাইতে আছে বিলাসবহুল হোটেল ও বার। রাজধানী ঢাকার গুলশানে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ছাড়াও রয়েছে ব্যক্তিগত অফিস। গাজীপুরে বাড়ি ছাড়াও শ্রীপুর, ভাওয়াল এবং কাঁচপুরে অন্তত ১৫০ বিঘা জমি কিনেছেন। ব্যাংকে করেছেন স্বজনপ্রীতি। অভিযোগ রয়েছে, নামে-বেনামে তার রয়েছে আরও একাধিক বাড়ি-ফ্ল্যাট ও প্লট। আলমগীর কবীরের রাজধানী ঢাকার কিছু ফ্ল্যাট ও সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখানে তুলে ধরা হল: হাউজ নং-১৪, রোড নং-৭৯, ফ্ল্যাট নং-৫০২, গুলশান-২ (কনকর্ড)। হাউজ নং-২৭, রোড নং-৫৫, ৫৫ তলা, গুলশান-২ ঢাকা। হাউজ নং-৩বি, রোড নং-৫৮, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, বাংলামোটর। রূপায়ন ট্রেড সেন্টার, ১১৪-১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, বাংলামোটর। রূপায়ন বিল্ডিং, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা। সিঙ্গাপুরের নামক অভিজাত এলাকায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের আলিশান ফ্ল্যাট, তাহার ঠিকানা হল কঊচচঊখ ইঅণ ঠওঊড, ০৫-১০, জবভষবপঃরড়হং ধঃ কবঢ়ঢ়বষ নু, ০৯৮৪০৭, ঝরহমধঢ়ড়ৎব.
স্বারক লিপিতে বলা হয়, ‘২০০৪ সালের আগ পর্যন্ত নিয়মিতভাবে উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। কিন্তু ২০০৪ সালে আলমগীর কবিরের চেয়ারম্যান পদে বসার পর টানা ১৭ বছর চলছে। এরপর আর কেউ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হতে পারেননি। ট্রেজারি শাখায় বসিয়েছেন নিজের সন্তানকে।’ চিঠিতে পাঁচ পরিচালক বলেছেন, ‘বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ছেলেকেও পরিচালক বানিয়েছেন আলমগীর কবির।
স্বারক লিপিতে উল্লেখ করা হয়,১৯৯৫ সালে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের (সেকেন্ড জেনারেশন) বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে সাউথইস্ট ব্যাংকের যাত্রা শুরু। ২০০৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে অন্য উদ্যোক্তা-পরিচালকরা নিয়মিতভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০২ সালে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন আলমগীর কবির। তিনি সাউথইস্ট ব্যাংকের উদ্যোক্তাও ছিলেন না। ২০০৪ সালে তিনি চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব¡ নেন এবং টানা ১৭ বছর এ পদে আসীন।
আমানতকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আলমগীর কবিরের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করা নিয়ে উদ্যোক্তা-পরিচালক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছিল। চেয়ারম্যান হিসেবে আলমগীর কবিরের একক নিয়ন্ত্রণ, একচ্ছত্র আধিপত্য এবং কর্তৃত্ব নিয়ে অন্য পরিচালকরা আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। তাতেও কাজ না হওয়ায় অন্য পরিচালকরা হতাশ হয়ে পড়েন। সভায় উপস্থিত না হওয়াই নিয়মে পরিণত হয় অনেক পরিচালকের। এ সুযোগে আলমগীর কবিরের অনিয়মের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
দুদক চেয়ারম্যানকে দেয়া চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ‘ব্যাংকটিতে এখন নিয়ম বলতে কিছু নেই। নিজস্ব লোকদের ঋণ দেয়া, চলতি ঋণের সুদ মওকুফ করে দেয়া, যাকে-তাকে ঋণ দেয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অন্য সব পরিচালকের পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদন করেন। বিশেষ সুবিধা নেয়ার মাধ্যমে এ ঋণ দেন। অন্যসব শেয়ারহাল্ডার, পরিচালকদের পরিচালক হিসেবেই গণ্য না করার স্বৈরাচারী মনমানসিকতা তৈরি হয়েছে তার মধ্যে।’
‘সাউথইস্ট ব্যাংকে বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ক্যাপিটাল লিমিটেডের ২১০ কোটি টাকা ঋণ থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকটির পরিচালক হন আলমগীর কবির নিয়ন্ত্রিত বে-লিজিংয়ের মনিরুজ্জামান। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এ তথ্য গোপন রাখা হয়। ফলে ২০২০ সালে এনওসি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এখানেই দুর্নীতির শেষ নয়। পরিচালক হিসেবে ব্যাংকের দুই দশমিক ৩৫ শতাংশ শেয়ার অর্থাৎ প্রায় ২৭ কোটি টাকার মালিকানা বুঝে পায় বে- লিজিং। আইন অনুযায়ী এ মালিকানার বিপরীতে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার অনুমতি রয়েছে। অথচ বে-লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বর্তমানে সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ৪০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা ভোগ করছে। সাউথইস্ট ব্যাংকের কলমানি থেকে ঋণ পাওয়া একমাত্র প্রতিষ্ঠানের নামও বে-লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট।’
স্বারক লিপিতে আরও বলা হয়, ‘আলমগীর কবিরের নিকটাত্মীয়ের (বেয়াই) মালিকানাধীন লুব-রেফ বাংলাদেশ লিমিটেডকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ৫৪ কোটি টাকার অধিক সুদসহ ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। কমিশন সুবিধা নিয়ে এক হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের অভিযোগও রয়েছে আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধে। যেসব ঋণের বিপরীতে পাঁচ বছর কোনো সুদ দিতে হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জাজ ভূঁইয়া গ্রুপ (৩০০ কোটি), সুয়াদ গার্মেন্টসের ১৫ কোটি, ফাহমি নিটের ৩০০ কোটি, সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট অতিক্রম করে কেয়া গ্রুপের ৯০০ কোটি এবং মাহাবুব স্পিনিংয়ের ১৫০ কোটি টাকা ঋণ উল্লেখযোগ্য।
‘সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে থাকা অবস্থায় তিনি ব্যাংকের অর্থে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বে-লিজিং এবং এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের বিপুল পরিমাণ শেয়ার ক্রয় করে এসব প্রতিষ্ঠানে কোথাও পরিচালক আবার কোথাও উপদেষ্টার পদ নিয়ে তৈরি করেছেন একটি চক্র। যার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে তিনি ব্যাপক লাভবান হয়েছেন আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংক। এমনকি এই দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে অনৈতিকভাবে মোটা অঙ্কের ঋণও দিয়েছেন তিনি।’ নিরপেক্ষ কোনো তদন্তে আলমগীর কবিরের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলেও স্বারক লিপিতে উল্লেখ করা হয়।
এ নিয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। অর্থপাচার ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও আলমগীর কবিরের পক্ষ থেকে উত্তর পাওয়া যায়নি।

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com