যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযানের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও ইরানকে নতিস্বীকার করানো সম্ভব হয়নি। বিমান হামলায় দেশটির সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রাণ হারিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তেহরানের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি কিংবা সাধারণ জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো প্রকাাশ্য বিদ্রোহে অংশ নেয়নি।
পরিস্থিতি বিবেচনায় ওয়াশিংটন এখন সামরিক অভিযানের পথ বদলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। ইরানের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলাই এই নতুন কৌশলের মূল উদ্দেশ্য। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তির মতো এই অর্থনৈতিক উদ্যোগও যুক্তরাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে পারবে না।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ সানাম ভাকিল মনে করেন, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সুজান ম্যালোনি জানান, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান আগের চেয়ে আরও বেশি শক্ত অবস্থান তৈরি করে বেরিয়ে এসেছে। ফলে যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ‘স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি’ এখন বাস্তবায়ন থেকে অনেক দূরে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র শুরুর দিকে বিমান ও নৌবাহিনীর বড় ক্ষতি এবং শীর্ষ নেতৃত্বের প্রাণহানি ঘটলেও শাসকগোষ্ঠীর পতন রোধ করা গেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী দ্রুত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা পুনরায় সচল করে মার্কিন ঘাঁটি ও আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেহরান কঠোর অবস্থান নেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করে তেহরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। তবে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির গবেষক সিনা তুসির মতে, কেবল অর্থনৈতিক চাপে একটি সরকারের পতন ঘটানোর পথ অত্যন্ত অস্পষ্ট। এমনকি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরণের অর্থনৈতিক অবরোধ শেষ পর্যন্ত নতুন করে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে।
বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি হামলা স্থগিত থাকলেও এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক চলাচল কিছুটা শিথিল করা হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। দুই দেশের সম্পর্কের মাঝে সমঝোতার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা না থাকায় দীর্ঘ ছয় মাসের এই ভূরাজনৈতিক অচলাবস্থার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।