মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতকে ঘিরে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক মার্কিন বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১০৫ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। এ হামলার পর পাল্টাপাল্টি হামলা ও হুমকিতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেকোনো সময় ইরানের ওপর আবারও হামলা চালানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও যুক্তরাষ্ট্রকে জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সিরিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগ
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হোরমোজগান প্রদেশের সিরিক বন্দরের কাছে কোহেস্তাক এলাকায় মার্কিন বিমান হামলায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট ও স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, ওই হামলায় শিশুসহ ৪ থেকে ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। আহতদের মধ্যে ১০৫ জন নারী ও শিশু রয়েছেন। তাদের অনেককে গুরুতর অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে হামলার পর বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে স্বজনদের আহাজারির চিত্রও উঠে এসেছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজক ও কনের বাবা আলী মাল্লাহি ঘটনাটিকে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাকায়ি হামলাটিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ ও বেআইনি হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ট্রাম্পের নতুন হুমকি
হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে একাধিক আগ্রাসী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী যেকোনো সময় ইরানে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই সাম্প্রতিক হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করেননি। তাঁর দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে না।
ইরানের পাল্টা হামলা
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন এবং ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই বলেছেন, সামরিক অভিযান, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলায় ইরান নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। তাঁর দাবি, শিগগিরই যুদ্ধের ময়দান ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এই নতুন কৌশলের প্রভাব দেখা যাবে।
ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
প্রতিবেশী দেশগুলোতেও উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি সংঘাতের প্রভাব পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।
জর্ডানও তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র লোহিত সাগরের আকাবা বন্দরের দিকে যাচ্ছিল বলে জানিয়েছে দেশটি।
এদিকে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজগুলোও সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়েছে। সাম্প্রতিক একটি হামলায় ফিলিপাইনের দুই নাবিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হয়নি। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার না থাকায় উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন হামলায় ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান এখনো অধরা। বরং পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা।
ইরানে বেসামরিক মানুষের হতাহতের এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনও ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।