তার মতে, যিনি যে খাতে অভিজ্ঞ, তাকে সেই খাতের দায়িত্ব দিলে সিদ্ধান্ত দ্রুত ও কার্যকর হবে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা নীতিনির্ধারণে গতিশীলতা আনতে পারে।জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন আগের চেয়ে বেশি।দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে কার্যকর করতে স্বাধীন সংস্থাগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করা প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যত বেশি উন্মুক্ত হবে, সরকারের প্রতি আস্থাও তত বাড়বে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল মনে করেন, মানুষের প্রত্যাশা-সুশাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং দুর্নীতিমুক্ত স্থিতিশীল বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার অতীত অভিজ্ঞতা ও দলীয় নির্বাচনী ওয়াদা পূরণের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী যাকে যে মন্ত্রণালয়ের জন্য যোগ্য মনে করবেন, সেই ভাবেই তিনি মন্ত্রিপরিষদ সাজাবেন।
একইভাবে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুনর্গঠন করে আইনের শাসনের প্রতি জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনার দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাসিবাদী আমলে ভেঙে পড়া সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে ঢেলে সাজিয়ে সরকারি সেবার মান জনগণের দোরগোড়ায় ঝামেলাহীনভাবে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা ও বিবেচনাও নিতে হবে।মন্ত্রীসভা গঠনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তিনি বলেন, তারেক রহমান দীর্ঘদিন খুব কাছ থেকে তার মা বেগম জিয়ার সরকার গঠন ও পরিচালনা প্রক্রিয়া অবলোকন করে যে অভিজ্ঞতা নিয়েছেন, আশা করা যায় সেই অভিজ্ঞতার একটি প্রতিফলন দেখা যাবে তার মন্ত্রীসভা তৈরির মাধ্যমে।
তার মতে, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় তিনি উন্নত বিশ্বের অনেক ধারণা বাংলাদেশে প্রবর্তনের একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের পাশাপাশি অনেক নতুন মুখও যুক্ত হতে পারেন মন্ত্রীসভায়।যেহেতু মন্ত্রীসভা গঠন একান্তই প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব ইচ্ছার প্রতিফলন, সেক্ষেত্রে ব্যক্তির নাম ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করা দলের প্রতি সুবিচার হিসেবে বিবেচিত হয় না।এছাড়াও বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিন পর রক্তস্নাত গণতান্ত্রিক যাত্রাকে তারেক রহমান সম্মানের সঙ্গে সমুন্নত রাখবেন এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ হোসেনের মতে, দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, যা শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত।জনগণ এখন মুখোমুখি সংঘাত বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতি নয়, বরং সংস্কার, পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার স্পষ্ট বার্তা প্রত্যাশা করছে।তার মতে, অর্থ মন্ত্রণালয়ে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যিনি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও দক্ষ নেতৃত্ব জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তিনি আরও বলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তরুণ ও নারী নেতৃত্বের দৃশ্যমান ও কার্যকর অন্তর্ভুক্তি সময়োপযোগী বার্তা দেবে।জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে জবাবদিহিতা ও সুশাসনের প্রতিফলন ঘটাতে পারলে নতুন সরকার একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এইচ এম আমজাদ হোসেন মোল্লা বলেন, এমন একটি মন্ত্রিপরিষদ হওয়া দরকার, যেখানে তরুণ-প্রবীণের মিশ্রণ থাকবে। যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিরা স্থান পাবেন, যাদের বিগত দিনে কোনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকবে না। দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদাকে মূল্যায়ন করে দল-মত নির্বিশেষে কাজ করতে হবে।
একজন সাধারণ নাগরিক ও গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আহসান হাবিব বলেন, এমন একটি মন্ত্রিসভা দেখতে চাই, যা জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তরিক ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে শাসনব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সুশৃঙ্খল ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।তিনি মনে করেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন সরকার যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করে-এটাই প্রত্যাশা। নতুন ও প্রবীণদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা হলে অভিজ্ঞতা ও উদ্যম-দুই-ই কাজে লাগবে।স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে সচেতন, বিবেকবান ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব থাকা জরুরি।সর্বোপরি, আইনশৃঙ্খলা ও নীতিনির্ধারণে শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই নতুন মন্ত্রিসভার প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ জরুরি বলে মনে করছেন কয়েকজন উদ্যোক্তা। তারা চান, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে উঠুক।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মন্ত্রীপরিষদের জন্য এটি হবে আস্থার পরীক্ষা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ এবং তার অগ্রগতি নিয়মিত জানানো গেলে ইতিবাচক বার্তা যাবে।জনগণ এখন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি চায়।সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা জটিল নয়-দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ।রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষ এবার কার্যকর, সৎ ও জবাবদিহিমূলক মন্ত্রিপরিষদ দেখতে চান। প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব ফলাফলই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নতুন মন্ত্রিসভা কতটা সফল হয়, সেটিই এখন সময়ের প্রশ্ন।
Leave a Reply