নিজস্ব প্রতিবেদক: WICE ২০২৬ আন্তর্জাতিক পর্ব, মালয়েশিয়া | বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ, প্রকল্প, অর্জন ও সফরের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত World Invention Competition and Exhibition-WICE ২০২৬-এর আন্তর্জাতিক পর্বে ড্রিমস অব বাংলাদেশ-Dreams of Bangladesh (DoB)-এর নেতৃত্বে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ২৩টি দল ১৭টি স্বর্ণপদক, ৬টি রৌপ্যপদক এবং অতিরিক্ত ৫টি বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেছে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি বাংলাদেশি দল পদক পেয়েছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রোবটিকস, পরিবেশ ও জীববিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণেরা আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও কারিগরি দক্ষতা তুলে ধরেছে।
১৯ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সফরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, বিচারক, সুপারভাইজার এবং আয়োজক প্রতিনিধিসহ প্রায় ১৪০ জন অংশ নেন। প্রতিনিধিদলের সদস্যদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় অনুযায়ী, আয়োজক Dreams of Bangladesh-এর বাইরে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল ৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ২টি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন-মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠান। Dreams of Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, এতগুলো প্রতিষ্ঠানকে একত্র করে এই পরিসরে WICE-এ বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের উদ্যোগ দেশে এই প্রথম।
এই আয়োজনের নেতৃত্ব ও সমন্বয়ে ছিল Dreams of Bangladesh। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানুষকে একই উদ্যোগে যুক্ত করার ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের গণ্ডির বাইরে দলগত কাজ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকল্প উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে। সফরে অভিভাবক ও শিক্ষকদের উপস্থিতি এবং সুপারভাইজারদের সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিনিধিদলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের WICE-এ অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে মোট ৪১২টি দল অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৯টি দেশের ২৫৮টি দল সরাসরি মালয়েশিয়ায় উপস্থিত হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের ২৩টি দল এই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের প্রকল্প উপস্থাপন করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে ৭ জন বিচারক আন্তর্জাতিক বিচারকার্যে অংশ নেন। ফলে প্রতিযোগী হিসেবে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিচারক হিসেবেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ছিল।
বাংলাদেশের উপস্থাপিত প্রকল্পগুলোতে রোবটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমতা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, কৃষি, উদ্ধার প্রযুক্তি এবং টেকসই উপকরণের ব্যবহার গুরুত্ব পেয়েছে। কিছু দল মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রোবট ব্যবহারের ধারণা উপস্থাপন করেছে; কিছু দল কৃষি, পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। প্রকল্পগুলো ছিল শিক্ষার্থীদের গবেষণা, নকশা, নির্মাণ ও পরীক্ষণের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে Phantom Forge উপস্থাপন করেছে Agri Nexus | The Aura Farmers-এর প্রকল্প ছিল জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে কৃষিকাজে সহায়তার উদ্দেশ্যে তৈরি Climate Adaptive Smart Farming Robot। এ ধরনের প্রকল্পে কৃষির প্রয়োজনের সঙ্গে রোবটিকস ও আধুনিক প্রযুক্তিকে যুক্ত করার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
উদ্ধার ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে BOTNIX-এর Borewell Rescue Robot সরু ও গভীর গর্তে উদ্ধারকাজে সহায়তার উদ্দেশ্যে উপস্থাপিত হয়। Quantum Spark-এর Fire Fighting & Rescue Robot এবং FireGuard 1.0-এর Autonomous Modular Fire Fighting Robot অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে রোবট ব্যবহারের ধারণা তুলে ধরে। SYT Innovators উপস্থাপন করে Al Military Rover এবং Revel উপস্থাপন করে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে জরুরি সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্দেশ্যে স্বয়ংক্রিয় রোবটের ধারণা।
পরিবেশ সুরক্ষায় Paradox উপস্থাপন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পরিবেশ পরিষ্কারের রোবট। EcoGuard-এর প্রকল্পে বায়ু ও পানির পরিবেশ সুরক্ষায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ধারণা এবং EcoNexus-এর প্রকল্পে পরিবেশবিষয়ক কাজে ড্রোন ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। Eco Warriors উপস্থাপন করে কারখানায় বায়ু পরিশোধন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রশমনের ব্যবস্থার ধারণা।
ফলিত জীববিজ্ঞান ও টেকসই উপকরণের ক্ষেত্রে Pharmagradable উপস্থাপন করে প্রাকৃতিকভাবে পচনশীল ওষুধের প্যাকেজিং। Ray Shield-এর প্রকল্প ছিল সৌরশক্তিচালিত মশা প্রতিরোধ ও আলোর ব্যবস্থা। Bio_Logik উপস্থাপন করে ইন্টারনেট অব থিংস বা IoT-ভিত্তিক সেপটিক ট্যাংক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। SolarEffix-এর প্রকল্পে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের ত্রুটি শনাক্ত ও কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ তুলে ধরা হয়।
এছাড়া Obsidian Prime-এর Depth Guard, InnovAid-এর Harmony, RoboBee Innovators-এর Hydrohelp, KSHEMANKARI-এর Care Companion, TerraFusion-এর Algae-Plast Fuel, Innertia-এর Wall-E, Quantis-এর HexaGlide এবং Noor Aero Next BD-এর SHIMANTO 1 বাংলাদেশের প্রকল্পসমূহের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করেছে। এসব প্রকল্পের বর্ণনা প্রতিযোগিতায় উপস্থাপিত ধারণা ও উদ্দেশ্য নির্দেশ করে; প্রকল্পগুলোকে আরও উন্নত করা এবং বাস্তব প্রয়োগের উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য পরবর্তী গবেষণা ও পরীক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
চূড়ান্ত ফলাফলে স্বর্ণপদক অর্জন করেছে Phantom Forge, Obsidian Prime, EcoGuard, SYT Innovators, BOTNIX, The Aura Farmers, Pharmagradable, Paradox, KSHEMANKARI, RayShield, Quantum Spark, Bio_Logik, TerraFusion, FireGuard 1.0, Innertia, EcoNexus এবং Eco Warriors। রৌপ্যপদক অর্জন করেছে InnovAid, RoboBee Innovators, SolarEffix, Quantis, Revel এবং Noor Aero Next BD I পদকের পাশাপাশি বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে The Aura Farmers, RayShield, Quantum Spark, Bio_Logik এবং Eco Warriors। এই হিসাবে বাংলাদেশের মোট অর্জন ২৩টি পদক ও অতিরিক্ত ৫টি বিশেষ পুরস্কার।
প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে BRAC University, Jahangirnagar University, University of Dhaka-এর Institute of Business Administration (IBA), Bangladesh University of Engineering and Technology (BUET), Military Institute of Science and Technology (MIST), East West University, Northern University Bangladesh, Bangladesh University এবং Educlaas University I
স্কুল ও কলেজগুলোর মধ্যে রয়েছে আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হাই স্কুল, সিলেট ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ পাবলিক কলেজ, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, স্কলার্সহোম, সিলেট, মাইলস্টোন কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল এবং শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ-১।
এই তালিকায় আরও রয়েছে কলেজ অফ ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, প্লেপেন স্কুল, ঢাকা, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল, এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল, কেএফটি কলেজিয়েট স্কুল, সেন্ট জোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, গাজীপুর।
Cantonment Public School and College, Birshreshtha Noor Mohammad Public College, Bhairab Govt. Kadir Baksa Pilot Model High School, Bangladesh Gas Fields School & College এবং Ideal Little Flower School। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন হিসেবে রয়েছে Penny Bee Solutions এবং Think Tank I এই নামগুলো প্রতিনিধিদলের সদস্যদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সফর শুরু হয় ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রার মধ্য দিয়ে। ২০ সেপ্টেম্বর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশ দল অংশ নেয়। উদ্বোধনী আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং অন্য দেশের অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পায়।
২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প উপস্থাপন ও বিচারকার্য। এদিন দলগুলো নিজেদের প্রকল্পের উদ্দেশ্য, নকশা, কাজের পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য প্রয়োগ বিচারকদের সামনে তুলে ধরে। প্রকল্প নির্মাণের পাশাপাশি তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং দল হিসেবে উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা ছিল এই পর্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২২ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধিদল কুয়ালালামপুরে নগরভ্রমণে অংশ নেয়। সফরের বিভিন্ন সময়ে KL Tower, National Monument, National Mosque-সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করা হয়। এর মাধ্যমে সদস্যরা মালয়েশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও নগরজীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।
২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের দলগুলোর অর্জন ঘোষণা করা হয়। ২৩টি দলের প্রত্যেকটির পদক অর্জন পুরো প্রতিনিধিদলের জন্য সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, সুপারভাইজার এবং আয়োজকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এই ফলাফলের মাধ্যমে স্বীকৃতি পায়।
২৪ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধিদলের সদস্যরা Genting Highlands, Batu Caves-সহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণে অংশ নেন। প্রতিযোগিতার বাইরের এই অভিজ্ঞতা সফরে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক পরিচয়ের নতুন মাত্রা যোগ করে। ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল দেশে ফিরে আসে।
WICE ২০২৬-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের গুরুত্ব পদক অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরুণদের একত্র করা, আন্তর্জাতিক মানের উপস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিচর্চাকে উৎসাহিত করার মধ্যেও রয়েছে। Dreams of Bangladesh-এর নেতৃত্বে এই উদ্যোগ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবার ও সংগঠকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ তৈরি করেছে।
এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞান, যোগাযোগ ও আত্মবিশ্বাস তরুণদের ভবিষ্যৎ গবেষণা ও প্রকল্প উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোকে ধারাবাহিক কারিগরি পরামর্শ, পরীক্ষণের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া গেলে প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবনচর্চায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।