শনিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৩, ০২:৩০ পূর্বাহ্ন

পর্যটকের অপেক্ষায় ঝালকাঠির পেয়ারারাজ্য

পর্যটকের অপেক্ষায় ঝালকাঠির পেয়ারারাজ্য

সিরাজুল ইসলাম সজল ”

ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটক বরণে প্রস্তুত দক্ষিণের জেলা ঝালকাঠির বাংলার আপেল খ্যাত পেয়ারারাজ্য। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের ফলে এবার পর্যটকদের চাপ কয়েকগুণ বেশি হবে বলে আশা পর্যটন সংশ্লিষ্টদের। পর্যটকদের আগমনে বাড়বে পেয়ারার চাহিদা। সেই সঙ্গে বাড়বে দামও।

অপরদিকে পর্যটকদের আগমনে ভাসমান পেয়ারা বাজারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখছেন। পর্যটকদের বাড়তি বিনোদনের সুবিধা দিতে গড়ে উঠেছে কয়েকটি পার্কও। পেয়ারা বাগানের মধ্যেই এ পার্কগুলো স্থাপন করা হয়েছে নান্দনিক শৈল্পিক ব্যবস্থাপনায়। রয়েছে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার ও বিভিন্ন জাতীয় ফাস্টফুড।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভীমরুলী ভাসমান পেয়ারা বাজার সংলগ্ন মাত্র ৩০ গজের মধ্যেই রয়েছে গৌরব ইকোপার্ক। দুই একর জমিতে নিজস্ব অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় এ পার্কটি গড়ে তুলেছেন বেকার যুবক গৌতম রায় সুমন। পার্কটির ভেতরে রয়েছে অর্ধশত বসার স্থান, শিশুদের খেলার জন্য দোলনাসহ বিভিন্ন ধরনের আয়োজন। সড়ক ও নৌ উভয় পথেই পেয়ারা বাগানে ভ্রমণকালে এ পার্কটিতে বিনোদন সুবিধা নিতে পারবেন আগন্তুক পর্যটকরা।

পর্যটকের অপেক্ষায় ঝালকাঠির পেয়ারারাজ্য

এছাড়া বিশাল পেয়ারা রাজ্য এলাকায় বাগানের ভেতরেই রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি পার্ক। করোনার মধ্যেও এসব এলাকায় ছিল পর্যটক ও বিনোদনপ্রেমীদের উপচেপড়া ভিড়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঝালকাঠি সদর, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি ও বরিশালের বানারিপাড়া উপজেলার ৫৫ গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে মিষ্টি পেয়ারারাজ্য। প্রতি বছর আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস এলেই পেয়ারার কারণে পাল্টে যায় এ অঞ্চলের চিত্র। পেয়ারা বিক্রির জন্য রয়েছে ভাসমান বাজার। প্রতিদিন কয়েকশ নৌকায় চাষিরা আসে পেয়ারা বিক্রি করেন।

পেয়ারা কিনতে ট্রাক ও বড় বড় ট্রলার নিয়ে আসেন পাইকাররা। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় আরিচা ফেরিঘাটের বিড়ম্বনা না থাকায় পাইকার ও পর্যটকদের আগমন প্রতি বছরের চেয়ে এ বছর বেশি হবে। ফলে এ অঞ্চলের শুধু পেয়ারাই নয় অন্য কৃষি পণ্যও ঢাকাসহ সারাদেশে অল্প সময়ে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পণ্যের ন্যায্য ও কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাবেন বলে আশায় বুক বেঁধেছেন চাষিরা।

এছাড়া প্রাকৃতিক অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। শুধু দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই নয়, বাংলাদেশে প্রবাসী বিদেশি অতিথিরাও আসেন উপভোগ করতে।

স্থানীয়র জানান, এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ভাসমান হাট সদর উপজেলার ভীমরুলীতে, যা সারাদেশেই অনন্য। এছাড়া পাশের পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির (নেছারাবাদ) আটঘর, কুড়িয়ানা, আতা, ঝালকাঠির মাদ্রা। এসবই পিরোজপুর সন্ধ্যা নদী থেকে বয়ে আসা একই খালপাড়ে অবস্থিত।

ভীমরুলী এলাকার পেয়ারা চাষি গৌতম মিস্ত্রি বলেন, ‘আমরা কয়েক পুরুষ পেয়ারা চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করি। এ বছর বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে তেমন বৃষ্টি হয়নি। যা হয়েছে তাও আবার উত্তর-পশ্চিম দিকের ঠান্ডা বৃষ্টি। ওই বৃষ্টির কারণে পেয়ারা গাছে ফুল দেরিতে আসছে। যদি পূর্ব দিকের বৃষ্টি হতো তাহলে তা একটু গরম থাকতো। আর পেয়ারা গাছেও ফুল তাড়াতাড়ি আসতো।’

একই অভিজ্ঞতা কথা জানান আদমকাঠি গ্রামের পেয়ারা চাষি প্রেমানন্দ মন্ডল (৭০)। পেয়ারার ফলন দেরিতে হলেও সুবিধাজনক দিক হিসেবে গ্রহণ করছেন তারা। ঈদুল আজহার কয়েকদিনের মধ্যেই পেয়ারা পাকতে শুরু করবে। ঈদের ছুটির ফাঁকে ভ্রমণপিপাসু ও বিনোদনপ্রেমীরা ভাসমান পেয়ারাবাজার পরিদর্শনে এলে তারা ভরা মৌসুম দেখতে পাবেন।

পর্যটকের অপেক্ষায় ঝালকাঠির পেয়ারারাজ্য

ডুমুরিয়া গ্রামের পঙ্কজ বড়াল বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম সহজ মাধ্যম পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় পাইকার ও পর্যটকদের আগমন প্রতিবছরের চেয়ে এবছর বেশি হবে। ফলে পেয়ারার সঙ্গে অন্য কৃষি পণ্যও পাইকাররা কিনে অল্প সময়ে ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহ করতে পারবে। এতে আমরা পণ্যের ন্যায্য ও কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাবো।’

গৌরব ইকো পার্কের সত্ত্বাধিকারী গৌতম রায় সুমন  বলেন, ‘একসময় গণপূর্ত বিভাগে ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। মা মারা যাওয়ার পর বাবার সঙ্গ দিতেই ঠিকাদারি কাজ ছেড়ে এলাকায় আসি এবং নিজেদের জমি দেখাশোনা করি। একপর্যায়ে ভাসমান বাজার (স্বীকৃতিকালীন) পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। দুইএকর জমিতে পার্কটি স্থাপন করা হলেও বর্গাকৃতি করতে ২০ শতাংশ জমি লিজ নেওয়া হয়েছে। বাকি পুরোটাই পৈতৃক সম্পত্তি। এখানে আনন্দ বিনোদনের জন্য মনোরম ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফাস্টফুড, সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও। যাতে দূরদূরান্ত থেকে আগত পর্যটক ও বিনোদনপ্রেমীরা এসে এখানে নির্বিঘ্নে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।’

সম্ভাবনার কথা জানিয়ে ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম  বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় আরিচা ফেরিঘাটের বিড়ম্বনা না থাকায় পাইকার ও পর্যটকদের আগমন প্রতিবছরের চেয়ে এবার বেশি হবে। ফলে এ অঞ্চলের শুধু পেয়ারাই নয় অন্য কৃষি পণ্যও ঢাকাসহ সারাদেশে অল্প সময়ে সরবরাহ সম্ভব হবে। এছাড়া পর্যটকদের জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি বিনোদন স্পট। সেগুলোকেও পেয়ারা মৌসুমকে ঘিরে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রতি বছরের চেয়ে এ বছর দেশি-বিদেশি পর্যটক অনেক বেশি আসবেন, অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি দৃঢ় হবে।

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com