বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৯ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ৪ টাকা বাড়ল ভারি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৩ মাস সহায়তা দেবে সরকার :প্রধানমন্ত্রী পটুয়াখালীর এমপিওভুক্ত কলেজে চরম অনিয়ম: ৪০ শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত মাত্র ২, নেই শিক্ষার্থী বন্যার পূর্বাভাস, নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু পুলিশে নতুন করে ১৪ হাজার ৫০০ পদ সৃষ্টি হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোয়ালন্দে ‘পার্টনার’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: স্বজনপ্রীতিতে বঞ্চিত কৃষক, তদন্তের দাবি ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগে মধুপুর ছকিরননেছা সঃ প্রাঃ বিদ্যালয়ে তদন্ত, ভিডিও ভাইরাল, সত্যতা মিলেছে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার ইরানের : রাশিয়া মানবিক রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে সবাই ন্যায়বিচার পাবেন: প্রধানমন্ত্রী
ধর্ম, রাজনীতি ও আমাদের মূল্যবোধ, পর্ব- ৩

ধর্ম, রাজনীতি ও আমাদের মূল্যবোধ, পর্ব- ৩

একটি সম্প্রদায়ের উপরে আরেকটি সম্প্রদায়ের সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ একটি মানবতা বিরোধী অপরাধ তাই অপরাধে জড়িতদের কঠিন সাজা নিশ্চিত করণে প্রশাসনের কোন গাফিলতি সহ্য করা হবে না, যে কোন উপায়ে মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মানুভুতিতে আঘাত করা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখামুখি করতে হবে

আহমদিয়া মতবাদের সাথে ইসলামের শরিয়তিপন্থীদের  কিছু মতপার্থক্য আছে। তারা মনে করে যে, ১৫০০ বছরের আগের তৈরি করা আইন যুগের কারণে সংস্কার কিংবা পরিবর্তন হওয়া উচিত। তারা মনে করেন এটা দোষের কিছু নেই। বাজারে সংখ্যাগুরুরা আহমদিয়াদের নিয়ে অনেক গুজব কিংবা বানানো গল্প চালু রেখেছে। যেমন- তারা প্রচার করে আহমদিয়ারা নবী মুহাম্মদকে মানে না। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

আমাদের আলাপের বিষয় আহমদিয়াদের ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা শরিয়তি ইসলামের সাথে তাদের কতোটুকু মতভেদ সে বিষয় নয়। আমাদের আলোচনার বিষয় বাংলাদেশে এর উপর যে নীরব নির্যাতন চলে সেই বিষটি। এরা নিজেদের কখনো অমুসলিম না বললেও সংখ্যাগুরু বিশেষ করে সুন্নিরা তাদের মুসলিম বলে স্বীকার করে না। ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশদের থেকে আহমদিয়া সম্প্রদায় বিদ্যালয় বানানো এবং সম্প্রদায়ের পক্ষে অনেক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। এখানে স্মরণে রাখা উচিত আহমদিয়াদের অনেকে কাদিয়ানী বললেও আহমদিয়া এই “কাদিয়ানী” ডাকটা অপমানজনক হিসেবে দেখে।

১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি একজন আহমদিয়ার করব দেওয়াকে কেন্দ্র করে আহমদিয়াদের উপর অত্যাচারের সূত্রপাত হয় এবং আহমদিয়াদের হত্যা, তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে লুটপাটের মতো ভয়াবহ রূপ লাভ করলে ৪ মার্চ পাকিস্তানে প্রথম আঞ্চলিক মার্শাল ল জারি হয়। মূলত এই দাঙ্গার কারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রথম দেশ শাসনের স্বাদ গ্রহণ করে। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে যে হত্যা শুরু হয় যা চলে ১১ মে পর্যন্ত। এবং তাতে নিহত হয় কম করে পাঁচ হাজার।

২০১৩ সালে শাহবাগের বিপরীতে হেফাজত ইসলামের জন্ম হয়। শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবী পেশ করে। সেই দাবীর একটি দাবী ছিল-সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের (আহমদিয়া) অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সকল অপ-তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। হেফাজতে ইসলাম যেহেতু সুন্নি সংগঠন সেহেতু তারা এমন একটা দাবী তুলবে তা স্বাভাবিক বিষয় ছিল। বাংলাদেশে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বদলে শিয়া সম্প্রদায় থাকলে হয়তো তাদের বিরুদ্ধে এমনটি উচ্চারণ করার সাহস পেত না। এর মানে এই না যে শিয়াদের তারা মেনে নিয়েছে। বর্তমানে শিয়াদের যেহেতু ক্ষমতা, অর্থ হয়েছে সেহেতু শরিয়তপন্থীরা শিয়াদের মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এখনও শিয়া সুন্নিদের বিরোধ আছেই। শিয়াদেরও তারা কাফের বলে। তবে কাদিয়ানিদের অবস্থা শিয়াদের থেকে নাজুক। এখানে বলে রাখা শিয়ারাও অত্যাচার কম করে না। যাই হোক, বাংলাদেশে এক সময় কয়েক লক্ষ কাদিয়ানি ছিল। বর্তমানে তা হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। বাংলাদেশে আহমদিয়া মসজিদে হামলা, ধরে ধরে কনভার্ট করার মতন ঘটনা ঘটছে নীরবে। কিন্তু প্রশাসন ও রাষ্ট্র সবসময় এই বিষয়টিতে উদাসীনতা দেখিয়ে আসছে। বাংলাদেশে আহমদিয়াদের উপর হামলার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ১৯৯৯-২০০৬ পর্যন্ত। ৮ অক্টোবর, ১৯৯৯ সালে খুলনা শহরে আহমদিয়া মসজিদে বোম হামলায় ৮ জন নিহত। হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠন হুজি। তবে বিএনপি-জামাত সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ২০০৩ সালে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপর ক্রমাগত হামলা আসতে থাকে। সে সময় আমাদের পত্রিকাগুলো বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে। ২০০২/০৩ এর দিকে আমিনীর কওমী সংগঠনের ব্যানারে আহমদিয়া মসজিদে ‘উপাসনালয়’ সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল সম্পূর্ণ রাস্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সহকারে! কেউ যাতে সাইনবোর্ডটি খুলতে না পারে,২৪ঘন্টার পুলিশি পাহারা পর্যন্ত দেয়া হয়েছিলI বিভিন্ন দেশে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপর হামলা অব্যাহত আছে।

‘খতমে নবুয়ত’ নামের একটি সংগঠন আছে যারা আহমদিয়াদের উপর অত্যাচার চালায় ও অত্যাচারের নেতৃত্ব দেয়। ‘খতমে নবুয়ত’ নামের এই সংগঠনটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আহমদিয়াদের উপর হামলা ও তাদের সুন্নি মুসলিমে ধর্মান্তরিত করার ঘৃণিত কাজ করে আসছে। আহমদিয়াদের উপর হামলা বেশির ভাগ সময় চেপে যাওয়া হয়। তারপরও কিছু কিছু পত্রিকায় বিভিন্ন খরব প্রকাশিত হয়। যেমন ২০১০ সালের ১৯শে জুন দৈনিক ডেইলি স্টার Ahmadiyyas in Tangail attacked নামে একটি সংবাদ প্রকাশ করেন। এছাড়া ঢাকার আশেপাশে, চট্টগ্রাম, রংপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে হামলা ও সুন্নি মুসলমানে দীক্ষা দেওয়ার মতন ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ থেকেও আহমদিয়ারা চলে যাচ্ছে এর মূল কারণ এরা কোণঠাসা এবং নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে।সমগ্র বিশ্বের মতন বাংলাদেশেও চলছে বিশ্বাসের নির্যাতন। সংখ্যাগুরুরা সুযোগ পেলেই তাদের বিশ্বাস অন্যদের উপর চাপিয়ে দিতে পছন্দ করে। সেটি হোক ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক বিশ্বাস। ধর্মীয় বিশ্বাসের নির্যাতন শুধু ভিন্ন ধর্মের মানুষই হয় না, নিজ ধর্মের ভিন্ন বিশ্বাসীরাও হয়। আহমদিয়ারা সংখ্যায় কম ও নিপীড়িত সম্প্রদায় হওয়ায় খ্রিস্টান চার্চের মতন তাদেরও তালিকা থাকে। এই সম্প্রদায়ের কেউ জীবনের ঝুকিতে পড়লে তাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কয়েকটি সংগঠন কাজ করে। এছাড়া নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়লে অনেকে নিজ উদ্যোগে দেশ ত্যাগ করে। তবে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ কল্পনা করি যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন হবে সবার জন্য সমান, সকল সম্প্রদায়ের মানুষ পাবে নিজ ধর্ম পালনের নিরাপত্তা ও অধিকার।

চলবে……

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Comments are closed.

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com