মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু পুলিশে নতুন করে ১৪ হাজার ৫০০ পদ সৃষ্টি হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোয়ালন্দে ‘পার্টনার’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: স্বজনপ্রীতিতে বঞ্চিত কৃষক, তদন্তের দাবি ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগে মধুপুর ছকিরননেছা সঃ প্রাঃ বিদ্যালয়ে তদন্ত, ভিডিও ভাইরাল, সত্যতা মিলেছে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার ইরানের : রাশিয়া মানবিক রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে সবাই ন্যায়বিচার পাবেন: প্রধানমন্ত্রী কালবৈশাখীর পূর্বাভাস, ৭ অঞ্চলে সতর্কবার্তা সংসদে সাত বীরশ্রেষ্ঠের নামে গ্যালারি, মূল ফটক এম এ জি ওসমানী রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম বসছে আজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইক্রোবাস খাদে, প্রাণ গেল ৩ জনের
গোয়ালন্দে ‘পার্টনার’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: স্বজনপ্রীতিতে বঞ্চিত কৃষক, তদন্তের দাবি

গোয়ালন্দে ‘পার্টনার’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: স্বজনপ্রীতিতে বঞ্চিত কৃষক, তদন্তের দাবি

জাহিদুল ইসলাম রাজবাড়ী প্রতিনিধি: সরকার যখন আধুনিক কৃষি ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পার্টনার’ প্রকল্পের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে, তখন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিসে দেখা গেল এক ভিন্ন চিত্র। মাঠের প্রকৃত কৃষকদের অন্ধকারে রেখে অনেকটা ‘গোপনেই’ সম্পন্ন করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ‘গ্যাপ (GAP) সার্টিফিকেশন প্রশিক্ষণ’।

অভিযোগ উঠেছে, প্রশিক্ষণের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন কৃষি কর্মকর্তার পছন্দের মানুষ, স্বজন ও ভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা।এমনকি প্রশিক্ষণ শেষে বিতরণ করা হয়েছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার আগাম স্বাক্ষর করা ‘ফাঁকা সনদপত্র’। প্রকৃত কৃষক বাদ, প্রশিক্ষণার্থী যখন ছাত্র ও দোকানি!সোমবার (২৭ এপ্রিল) গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিসে দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রশিক্ষণার্থীদের সারিতে বসে আছেন কলেজ পড়ুয়া ছাত্র, মুদি দোকানদার, চালক ও গৃহিনীরা। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, এই প্রশিক্ষণ পাওয়ার কথা ছিল সরাসরি চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকদের। প্রশিক্ষণে আসা মাফফুজা খাতুন নামের এক গৃহিনী সরাসরি স্বীকার করেন, তিনি কীভাবে তালিকায় এসেছেন তা জানেন না। তিনি বলেন, আমার স্বামী কৃষক, সে বিয়ে বাড়িতে গেছে দেখে আমি চলে আসছি। আমি জীবনে এই প্রথম কোনো কৃষি প্রশিক্ষণে আসলাম।

রানা শেখ নামের এক ছাত্র জানান, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে তিনি এসেছেন কারণ তার বাবা সময় পাননি। একই চিত্র দেখা যায় উজানচর ইউনিয়ন থেকে আসা সামির হাসান ও নাছিমা আক্তারের ক্ষেত্রেও। কোনোদিন জমিতে লাঙ্গল না ধরা এসব ব্যক্তিরা এখন সরকারি সনদে ‘প্রশিক্ষিত কৃষক’!

আগেভাগেই সই করা ‘ফাঁকা সনদ’ বিতরণ!

অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে যে সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে, তাতে প্রশিক্ষণার্থীর নাম-ঠিকানা বা কোনো তথ্যই ছিল না। অথচ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার স্বাক্ষর আগে থেকেই সেখানে শোভা পাচ্ছিল। এই ‘ব্ল্যাঙ্ক সার্টিফিকেট’ বা ফাঁকা সনদ বিতরণের মাধ্যমে জালিয়াতির বড় সুযোগ তৈরি করে রাখা হয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রশিক্ষণার্থী খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, বিরিয়ানির নামে যা দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের। মানসম্মত কোন খাবার দেয়া হয়নি।উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তীব্র ক্ষোভ।

মুসতাক নামের এক কৃষক বলেন, আমরা রোদে পুড়ে ফসল ফলাই, অথচ কৃষি অফিসে কী হয় তা জানতেই পারি না। যারা কোনোদিন মাটি স্পর্শ করেনি, তারা সার্টিফিকেট নিয়ে যাচ্ছে। এটা আমাদের সাথে প্রতারণা।

এবিষয়ে দেবগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি, মো. ইসমাইল মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, কৃষি অফিস নিয়মিতভাবে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে নামধারী কিছু ব্যক্তিকে যোগাযোগের মাধ্যমে গোপনে এসব প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি যেসব কৃষক সরকারি কৃষক কার্ড পেয়েছেন, তাদেরকেও এ ধরনের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য ডাকা হয়নি।
তিনি এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

দায় এড়ানোর চেষ্টা কৃষি কর্মকর্তার!
অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, সৈয়দ রায়হানুল হায়দার অনেকটা দায়সারা বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তালিকাটি আমার যাচাই করা হয়নি। তবে আমার বিশ্বাস তারা কৃষি পরিবারের সদস্য। অনৈতিক সুবিধার প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রকৃত কৃষকদের কেন জানানো হলো না—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস জেলা কৃষি অধিদপ্তরের!
বিষয়টি নিয়ে রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা, গোলাম রাসূল বলেন, সরকারি প্রশিক্ষণে অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি সহ্য করা হবে না। এবিষয়ে অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত,
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ‘গ্যাপ সার্টিফিকেশন’ অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু অযোগ্য ব্যক্তিদের এই সনদ প্রদানের মাধ্যমে পুরো প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকেই ‘গলা টিপে হত্যা’ করা হচ্ছে। সরকারি অর্থের এমন অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন।মাঠের কৃষকদের প্রশ্ন—সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুফল যদি শুধু কর্মকর্তাদের পছন্দের মানুষেরাই ভোগ করে, তবে আধুনিক কৃষির স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে?

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com