শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
টঙ্গী পশ্চিম থানায় বিশেষ অভিযানে ইয়াবা ও হেরোইনসহ একাধিক মাদক কারবারি গ্রেফতার রাশিয়ার তেল আমদানি: বাংলাদেশকে দুই মাসের ছাড় দিলো যুক্তরাষ্ট্র সিলেটে কিশোর গ্যাং দমনে ইতিবাচক পরিবর্তন -সম্ভাবনার পথে তরুণরা :পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম শেরপুরে এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের ল্যাপটপ উপহার দেয়ার ঘোষনা দিলেন সাবেক ছাত্রনেতা বুলবুল আহম্মেদ  জাতীয় ঐক্যই আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা: প্রধানমন্ত্রী টঙ্গী পশ্চিম থানার বিশেষ অভিযানে মাদকসহ গ্রেফতার ৩ দুবাইয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতা প্রকৌশলী আবু জাফর চৌধুরীর ইন্তেকাল খালেদা জিয়ার পক্ষে স্বাধীনতা পদক নিলেন জাইমা রহমান গণতন্ত্র ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তি সম্ভব নয় : স্পিকার হাম ও উপসর্গ নিয়ে ৮ শিশুর মৃত্যু
উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারের খরচে বিদেশে গিয়ে আয়েশী জীবনযাপন

উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারের খরচে বিদেশে গিয়ে আয়েশী জীবনযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে উপসচিব নুরুল করিম ভূইয়া ও তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনের বিরুদ্ধে। সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী হলেও এই দুই উপসচিব বিসিএস ২৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারে দাপুটে কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। দুর্নীতি দমন কমিশনে তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যেই গাজীপুর জেলায় ডিসি হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন নুরুল করিম ভূইয়া। আর তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনও আরেকটি জেলায় পদায়ন পেতে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে ওই উপসচিব নুরুল করিম ভূইয়া ও তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে কমিশন এ বিষয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তাও নিয়োগ করেছে। নিয়োগ পাওয়া অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক সৌরভ দাস ওই দুই উপসচিবের স্থাবর ও অস্থাবর অবৈধ সম্পদের খোঁজে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছেন।
সূত্র জানিয়েছে, ফেনির বাসিন্দা নুরুল করিম ভূইয়া বিসিএস ২৫ ব্যাচে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। চাকরি জীবনে বিভিন্ন উপজেলায় সহকারী ভূমি কমিশনার, সিনিয়র ভূমি কমিশনার, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর সিনিয়র সহকারী সচিব পদে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি জাপানে উচ্চশিক্ষার একটি কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য যান। একই বছর আরেকটি কোর্সের জন্য থাইল্যান্ডেও যান। ২০১৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৮ জুন পর্যন্ত পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করেন। এরপর ২০২২ সালের ১ আগস্ট ‘ডক্টর অব ফিলোসফি ইন কমিউনিকেশন’ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি রয়েছেন।
কিন্তু উচ্চশিক্ষার নামে নুরুল করিম ও তার স্ত্রী দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আমেরিকায় অবস্থান করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অর্থে সেখানে আয়েশী জীবনযাপন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আমেরিকার মতো ব্যয়বহুল দেশে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বহন করার মতো অর্থ সরকারি চাকরি করে কীভাবে সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন উপজেলায় ভূমি কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন করেন নুরুল করিম। এছাড়া দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন দপ্তরে থেকেও ঘুষ বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, উপসচিব নুরুল করিম ভূইয়া ও তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনের রোষানল থেকে বাঁচতে এবং হয়রানির প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক এক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার, যিনি মিনারা নাজনীনের আপন ভাই। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে। এমন অবস্থায় নুরুল করিম ভূইয়াকে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তার স্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-১ এর উপসচিব মিনারা নাজনীনও জেলায় পদায়ন পেতে তদবির করছেন।
এ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্পত্তিগত দ্বন্দ্বে স্বজনদের হয়রানি করতে পুলিশ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে তৎকালীন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপসচিব (বর্তমানে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক) নুরুল করিম ভূইয়া এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব (বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা-২) মিনারা নাজনীনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক সৌরভ দাসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে বিভিন্ন দপ্তরে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভূমি অফিস ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসে তাদের নামে-বেনামে সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, উপসচিব নুরুল করিম ভূইয়া ও তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হবে।
একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, নুরুল করিম ভূইয়া সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই ঘুষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। বটিয়াঘাটা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে ঘুষের বিনিময়ে সরকারি জমি বরাদ্দ দিয়েছেন। ঘুষের টাকায় ঢাকার জোয়ার সাহারা এলাকায় নিসর্গ সমবায় সমিতিতে কয়েক কাঠা জমি ক্রয় করেন। এছাড়া সরকারি জমিতে রিসোর্ট নির্মাণের জন্য অবৈধভাবে লিজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তিনি সরকারি চাকরিতে থেকে জমি কেনাবেচার দালালি করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এম এন হোমস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংকে হিসাব খুলে ঘুষের অর্থ লেনদেন করতেন। শাশুড়ির নামে এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রে বিপুল অর্থ সঞ্চয়ের অভিযোগও রয়েছে। ফেনির গ্রামের বাড়িতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন।
অন্যদিকে, মিনারা নাজনীন খুলনা ডিসি অফিসে কর্মরত থাকাকালে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুইবার স্ট্যান্ড রিলিজ হন বলে জানা গেছে। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ইউএনও থাকাকালে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ ৮ বছর তিনি আমেরিকায় অবস্থান করেছেন এবং সেখানে সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বহন করছেন, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, নুরুল করিম ভূইয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দোহার উপজেলার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে তারা বিপুল সম্পদের মালিক হন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার নামে তারা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে বিলাসী জীবনযাপন করেছেন এবং অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে তারা মামলা বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। সম্পত্তিগত বিরোধে মিনারা নাজনীন তার ভাইকে মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্বের অভিযোগের সঙ্গে নতুন অভিযোগ যুক্ত করে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র জানিয়েছে, নুরুল করিম ভূইয়া ও মিনারা নাজনীন বিসিএস ২৫ ব্যাচে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। অভিযোগ রয়েছে, মিনারা নাজনীন প্রকৃতপক্ষে খুলনার বাসিন্দা হলেও নওগা জেলার বাসিন্দা হিসেবে তথ্য দিয়ে চাকরি নেন। এর ফলে নিজ জেলায় দীর্ঘ সময় পদায়ন সুবিধা পান।

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com