ইশতিয়াক আহমেদ :
বাংলাদেশের লালমনিরহাটের বুড়িমারীতে মানসিক বিকারগ্রস্থ জনৈক শহীদুন্নবী জুয়েল নামের একব্যক্তিকে কয়েক হাজার মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। মেরেই ক্ষান্ত হয়নি তার মরদেহ আগুনে নিক্ষেপ ক’রে পুড়িয়ে দিয়েছে। কী অপরাধ জুয়েলের? তিনি নাকি ধর্ম অবমাননা করেছেন? রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুলের শিক্ষক জুয়েল মানসিক অবসাদগ্রস্থ ছিলেন। এই একজন মানসিক অবসাদগ্রস্থ শিক্ষককে সমাজের তথাকথিত সুস্থ ধর্মপ্রাণ মানুষেরা পাশবিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন দেখিয়ে বাংলাদেশে ধর্মের মান বাঁচিয়েছে!আমরা কোন্ অসভ্য দেশে বাস করছি, ভাবতে পারেন? একজন মানসিক রোগী – যাকে আমরা ভুল করে পাগল বলি, সেই একজন পাগলের অবমাননায় যদি ১৮০ কোটি মানুষের যাপিত ধর্ম এবং সে ধর্মের মালিক ওরফে স্রষ্টা বিপদে পড়েন, তবে সে ঠুনকো ধর্ম এবং সর্বশক্তিমান স্রষ্টার দরকার আছে কি? যাঁরা প্রতিদিন প্রতিমুহুর্তে এই সব না-দেখা সর্বশক্তিমানের শক্তিমত্তার প্রার্থনা করেন, তাঁরা একটু দয়া করে ভেবে দেখবেন। আর যদি পারেন তবে জুয়েল নামের এই মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষটার পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।
নোয়াখালী তে নুসরাত কে পুড়িয়ে মেরেছে তার নিজের সহপাঠী ও শিক্ষক। বাংলাদেশে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির চাইতে সাম্প্রদায়িক হামলার ঝুঁকি বেশী। নাসিরনগরে বৃদ্ধা নিয়তি চক্রবর্তীর হত্যাকারীদের সামনে রাষ্ট্র আজ অসহায়। উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে অসহায় হিন্দুদের সান্ত্বনা দেয়া যায় কি? ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তিথি সরকারকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিথি সরকারের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে ধর্ম নিয়ে কটুক্তির অভিযোগ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং-মানববন্ধন হয়েছে। জানি না, জীবন বাঁচাতে নাকি, নিহত হয়েই নিখোঁজ হয়ে গেছে মেয়েটি। আমি কোনোদিনই বুঝি নি, আজও বুঝি না; ঈশ্বর, যাকে আমরা ভগবান বা আল্লাহ বা যিশু বা বুদ্ধ বলি, এতোই স্পর্শকাতর তিনি বা তাঁর অস্তিত্ব?এতো সর্বশক্তিমান, এতো ক্ষমতাধর, এতো কিছু করছেন- মৃত ও জীবিত হাজার হাজার কোটি মানুষের পাপ-পুন্যের হিসেব রাখছেন, অথচ কোথাকার কোন্ চুনোপুটিকে তার বিরুদ্ধে বলার জন্য শায়েস্তা করতে পারছেন না? আর আমরা যাঁরা ওই স্রষ্টার উপর অসীম বিশ্বাসী, তাঁরাও একটু ধৈর্য ধারণ করে দেখতে পারছি না, দেখি স্রষ্টা কী বিচার করেন?
ধার্মিকরা নাস্তিকদের হত্যা করা ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করেন, কারণ ধর্ম-এ কোন অবিশ্বাসী যদি ধর্মের সমালোচনা করেন তাঁকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়। এই ধর্মীয় বিধানটি কিন্তু সম্পূর্ণ মানুষের মনের আদিম ধ্বংসাত্বক প্রবৃত্তি কারণ আদিম মানুষেরা তাঁদের বিরোধী কোন গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকত এমনকি সুযোগ পেলে গুপ্তহত্যাও করত। এই প্রবৃত্তি দ্বারাই অনুপ্রাণিত ধর্মগুরুরা এই ধরনের প্রবৃত্তি নির্ভর আইন চালু করেছিলেন। একজন যুক্তি নির্ভর মানুষ কখনওই পারে না বিপরীত যুক্তি দেয়া মানুষকে হত্যা করতে, কারণ সে জানে মত প্রকাশ কোন অপরাধ নয়। স্বাধীন মত প্রকাশ যদি অপরাধ হয় তবে মানুষ কখনওই চাইবে না মুখ ফুটে নিজের কথা বলতে, এতে করে সমাজের ক্ষতি হবে। হত্যা করে কখনওই ভিন্নমতকে ভুল প্রমাণিত করা যায় না বরং মানুষ হত্যাকারী-কেই সন্দেহ করে এবং নিহত মত প্রকাশকারীদের লেখা পড়তে উৎসাহিত হয়। কিন্তু ধার্মিকেরা হত্যা করা ছাড়া অন্য কোন উপায় অবলম্বন করতে জানে না। এর কারণ লেখকদের হত্যা করতে না পারলে ধর্মের প্রবৃত্তিনির্ভর মানবতাবিরোধী আইনগুলো সামান্য যুক্তির ভারেই অকেজো প্রমাণিত হয়ে যায়। তাই ধার্মিকদের-কে ধর্মীয় আইনে উৎসাহিত দেয়া হয় যে, “যত বেশী পার নাস্তিক কতল কর!” অন্য ধার্মিকেরাও এতে উৎসাহ দেয় এবং মনে করে তাঁদের ধর্ম বুঝি বেঁচে গেল! অথচ ধর্ম পালন ও শেখাই মানুষের প্রধান কর্তব্য নয়। নিজেকে জানাই প্রধান। নিজেকে জানলে, অদৃশ্য-কাল্পনিক ঈশ্বর নামক কোনো জীবের কাছে মাথা নত করার প্রয়োজন নেই। নিজেই ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সবকিছু উপলব্ধি করতে পারেন। ফলে তিনি কারো ক্ষতি করেন না, অসৎ উপায়ে ধন-সম্পদ বা চুরি-ডাকাতি, ঘুষ-দুর্নীতি… করেন না।সত্যের ব্যতিক্রম হলেই সব উচ্ছৃঙ্খল। সত্যের অভাবেই ধর্ম লোকদেখানো পালনীয় অভ্যাসে পরিণত। অথচ কোনোকিছুই পালন করলেই হবে না, অন্তরে লালন/ধারণ করতে হবে। যদিও পালন করা সহজ কিন্তু লালন করা অত্যন্ত কঠিন। তবে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি- কঠিনকে নয়, সহজকেই গ্রহণ করা। তাই অধিকাংশই কঠিন মানবিক মূল্যবোধের পরিবর্তে সহজ ধর্মকেই বেছে নিয়েছে।সবচেয়ে অবাক ও ভয়ানক, এসব কেউ বোঝাতে চাইলেও ধার্মিকরা বুঝতে চায় না। ভয়ানক এজন্যই, যদি কেউ শিশুকালে ধর্মশিক্ষায় সন্ত্রাসী হওয়ার মন্ত্র পেয়ে থাকে, তাহলে তাকে দিয়ে যেকোনো নৃশংস্য হত্যাকাণ্ড/খারাপ কাজ করিয়ে নেয়া সম্ভব। কেননা ধর্মের বিভ্রান্তিকর শিক্ষার কারণেই- কারো চিত্ত বিকৃত, কারোটা জটিল, কারোটা অত্যন্ত জটিল; অনেকের সহজ-সরল হলেও, যতোটা হওয়ার কথা, ধর্ম কাউকেই ততোটা হতে দেয় না। কারণ হৃদয়কে সংকীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ রাখাই ধর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য। গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে না যাওয়ার জন্য দিবারাত্র সতর্ক ও ভয়ানক ভীতি প্রদর্শন আমৃত্যুই চলতে থাকে। অর্থাৎ ধর্ম মানব চিত্তের স্বাধীনতা দেওয়ার মতো উদার নয়। সেজন্যই ধর্মে-ধর্মে এমনকি একই ধর্মের মধ্যেও এতো মতপার্থক্য এবং বনিবনা হয় না। হতেই পারে না।
চলবে…..