জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক বয়ানে পরিণত না করে প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে জাতীয় ইতিহাস চর্চার একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এখানে কোনো ধরনের দলীয় ইতিহাস স্থান পাওয়া উচিত নয়।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর গণভবনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের কিছু অংশ অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। পরিচিত কিছু মুখ ও ঘটনার উপস্থিতি বারবার এসেছে। তবে গণঅভ্যুত্থানের বিস্তৃত পরিসর, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও অঞ্চলের মানুষের আন্দোলন এবং অবদান সেভাবে ফুটে ওঠেনি।
তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে সময়ের ধারাবাহিকতায় আন্দোলনের ঘটনাগুলো সাজানো প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পর্যায়ের আন্দোলনের চিত্রগুলো আলাদাভাবে তুলে ধরা উচিত। এসব জায়গাতেও নির্যাতন, প্রতিরোধ ও মানুষের অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে।
অতীতে ইতিহাসচর্চার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি সতর্ক করেন, অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও দলীয়করণের নানা অভিযোগ ছিল। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের বয়ান পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে যেন একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস এমনভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করতে হবে, যাতে দেশের সব নাগরিক সেটিকে নিজেদের ইতিহাস হিসেবে স্বাচ্ছন্দ্যে ধারণ করতে পারেন। একই সঙ্গে প্রকৃত সত্য যেন কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে বিকৃত বা পরিবর্তিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
জাদুঘরের বর্তমান জনবল ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল বর্তমানে নেই। প্রায় ২০০ জনের মতো কর্মী প্রয়োজন হলেও এখন মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন কাজ করছেন। স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় কার্যক্রম চালানোয় গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
তিনি জাদুঘর পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ ও জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, জাদুঘরটি স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও রূপরেখা তৈরি করা দরকার। গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে এটি পরিচালনা করা উচিত।
জাদুঘরে শহীদ আবু সাঈদের ছবি প্রদর্শনীতে না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আবু সাঈদ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান প্রতীক। বিষয়টি জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তারা নিশ্চিত করেছে যে, আবু সাঈদকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে এবং তা জাদুঘরে প্রদর্শন করা হবে।
একই সঙ্গে শহীদদের স্মারকচিহ্নগুলোর শৈল্পিক উপস্থাপন এবং গণভবনের পুরো ১৭ একর জায়গা কাজে লাগিয়ে জাদুঘরের পরিসর বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সীমান্ত হত্যা, ভারতবিরোধী আন্দোলনসহ গত ১৬ বছরে দেশের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের প্রতিরোধের বিজয়ী ইতিহাসও সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের একক সম্পত্তি নয়। এটি পুরো সাধারণ মানুষের আন্দোলন ও বিজয়ের প্রতীক। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে জাদুঘরকে একটি নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ ও জাতীয় ইতিহাস চর্চার কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।