• মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪২ পূর্বাহ্ন

পাকিস্তান-চীনকে মোকাবিলায় ৬ অত্যাধুনিক সাবমেরিন কিনছে ভারত

Reporter Name / ৬ Time View
Update : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে নিজেদের নৌ-সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়াতে জার্মানির কাছ থেকে ছয়টি অত্যাধুনিক প্রচলিত সাবমেরিন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। ‘প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৭০ হাজার কোটি রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রবিবার (১৬ আগস্ট) ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয়টি সাবমেরিন কেনার প্রস্তাব ইতোমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।

প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (TKMS) এবং ভারতের মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড যৌথভাবে সাবমেরিনগুলো নির্মাণ করবে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ভারতে এসব সাবমেরিন তৈরি করা হবে। এর ফলে একদিকে যেমন ভারতীয় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নতুন সাবমেরিনগুলো হবে টাইপ-২১৪ শ্রেণির এবং এতে থাকবে এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (AIP) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির কারণে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের তুলনায় দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করতে পারে এ ধরনের ডুবোজাহাজ।

সাধারণ প্রচলিত সাবমেরিনে পানির নিচে চলার জন্য ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করা হয়। ব্যাটারি পুনরায় চার্জ করতে নির্দিষ্ট সময় পর সাবমেরিনকে পানির ওপরে উঠতে বা স্নরকেল ব্যবহার করতে হয়। ফলে শত্রুর নজরে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এআইপি প্রযুক্তি সেই প্রয়োজন অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এতে সাবমেরিন দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে অপেক্ষাকৃত নীরবে অভিযান পরিচালনা করতে পারে। ফলে নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং শত্রু জাহাজে হামলার ক্ষেত্রে এ ধরনের সাবমেরিনের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।

প্রস্তাবিত সাবমেরিনগুলোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৫ মিটার। এগুলো বিশেষ ধরনের HY-100 ফেরোম্যাগনেটিক স্টিল দিয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সাবমেরিনের চৌম্বকীয় স্বাক্ষর বা ‘ম্যাগনেটিক সিগনেচার’ কম রাখা সম্ভব হবে। সমুদ্রের তলায় শত্রুপক্ষের নজরদারি ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষেত্রে কম চৌম্বকীয় স্বাক্ষর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি কম শব্দ উৎপাদনের সক্ষমতা সাবমেরিনগুলোকে আরও কার্যকর স্টেলথ প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে পারে।

প্রস্তাবিত সাবমেরিনগুলোতে ভারী অস্ত্র বহনের সক্ষমতাও থাকবে। এর মধ্যে ছয়টি ৫৩৩ মিলিমিটার টর্পেডো টিউব থাকার কথা রয়েছে। এগুলোতে হেভিওয়েট ব্ল্যাক শার্ক টর্পেডো ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের সংস্করণও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে এসব সাবমেরিন শুধু শত্রুর নজর এড়িয়ে সমুদ্রে টহল দেওয়ার জন্য নয়, প্রয়োজন হলে শত্রু যুদ্ধজাহাজে আক্রমণ চালানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

ভারতের জন্য প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব হলো—একই সময়ে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে নৌ-সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। আরব সাগরে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সামুদ্রিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের নৌ-তৎপরতা নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে নতুন সাবমেরিনগুলো ভারতের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে যুক্ত হতে পারে।

‘প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া’র পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। ২০১৮ সালে ভারতীয় নৌবাহিনী উন্নত প্রযুক্তির ছয়টি প্রচলিত সাবমেরিন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানায়। পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি ‘অ্যাকসেপ্টেন্স অব নেসেসিটি’ পর্যায়ে অনুমোদন করে। সে সময় প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৪৩ হাজার কোটি রুপি। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন কারণে সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে এখন প্রায় ৭০ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। এর আগে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে জার্মানির হাউন্ডসওয়ার্ক-ডয়চে ওয়েরফ্টের কাছ থেকে চারটি সাবমেরিন সংগ্রহ করেছিল ভারত। পরে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ডিসিএনএসের প্রযুক্তিগত সহায়তায় ছয়টি স্করপেন শ্রেণির সাবমেরিন নির্মাণ করে দেশটি। ওই কর্মসূচি ‘প্রজেক্ট-৭৫’ নামে পরিচিত।

এই সিরিজের প্রথম সাবমেরিন আইএনএস কালভারিকে ২০১৫ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিরিজের ষষ্ঠ ও শেষ সাবমেরিনও ২০২০ সালে নৌবাহিনীতে কমিশন পায়।

তবে এরপর কয়েক বছর নতুন কোনো সাবমেরিন নৌবহরে যুক্ত না হওয়ায় ভারতের সাবমেরিন বহরের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে ‘প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া’ বাস্তবায়নকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। ছয়টি নতুন এআইপি-সক্ষম সাবমেরিন ভারতীয় নৌবাহিনীতে যুক্ত হলে বঙ্গোপসাগর থেকে আরব সাগর পর্যন্ত ভারতের পানির নিচের যুদ্ধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category