• মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০১ পূর্বাহ্ন

যুদ্ধের ভয়ে ইয়েমেন ছেড়ে জিবুতির শরণার্থী শিবিরে হাজারো মানুষ

অনলাইন ডেস্ক / ২৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন শুরু হলেই কেঁপে ওঠে ইয়েমেনের ধুবাব শহরের ঘরবাড়ি। শিশুদের চিৎকার আর চারপাশের আতঙ্ক ৫০ বছর বয়সী ইব্রাহিম ইসাকে শেষ পর্যন্ত ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করেছে। পরিবারকে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে।

ইব্রাহিম ইসা একা নন। ইয়েমেনে হুতি ও সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে লোহিত সাগরের উপকূল ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে ছড়িয়ে পড়ায় বহু পরিবার প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়ছে। ইব্রাহিম নিজের মাছ ধরার বড় নৌকায় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কয়েকটি ছাগল নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জিবুতির ওবক শহরের মারকাজি শরণার্থী শিবিরে পৌঁছেছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও জিবুতি সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মারকাজি ক্যাম্পে নতুন আসা হাজারো মানুষ খোলা গুদাম ও তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন।

লোহিত সাগর ঘিরে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে এই শিবিরে তিন হাজারের বেশি নতুন শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে, ইয়েমেনজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়েছে।

২০১৪ সালে শুরু হওয়া ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় কিছুটা প্রশমিত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সেই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ে। দেশটির জনবহুল বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী হুতিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়তে থাকলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও ব্যাপক বিমান হামলা চালায়।

জবাবে হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখে। সংঘাতের এই পাল্টাপাল্টি হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষদের অবশ্য রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কিংবা সামরিক কৌশল নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। তাদের একমাত্র লক্ষ্য নিরাপদে বেঁচে থাকা। ১০০ বছর বয়সী সাবেক জেলে কাসিম আব্রাহাম আবসি বলেন, ‘কারা হামলা করছে তা আমরা জানি না। পাহাড়, রাস্তা-সব জায়গায় বোমা পড়ছিল। সন্তানদের বাঁচাতেই আমাদের এই পলায়ন।’

মারকাজি ক্যাম্পের চিত্রও সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। অনেকেই দেশ ছাড়ার সময় সামান্য কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে পারলেও অধিকাংশ পরিবার প্রায় খালি হাতেই সেখানে পৌঁছেছে। পরনের পোশাক ছাড়া তাদের সঙ্গে আর তেমন কিছুই নেই।

ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জিবুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক ঘাঁটি ক্যাম্প লেমনিয়ার রয়েছে। ২০০৩ সাল থেকে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির পাশাপাশি চীনেরও সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তবে ইয়েমেনের সংঘাতে জড়ানোর বদলে মানবিক কারণে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে জিবুতি।

তবে অনেকের জন্য এই আশ্রয় সাময়িক থাকছে না, বরং বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চিত জীবন কাটাতে হচ্ছে। এডেনের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আব্দুললারিম ২০১৫ সালে যুদ্ধ শুরুর পরপরই জিবুতিতে এসে আশ্রয় নেন। প্রায় এক দশক ধরে শিবিরের জীবন কাটানোর কারণে নতুন করে আসা মানুষদের দুর্ভোগ তিনি খুব কাছ থেকে অনুভব করছেন।

বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা বেশি হলেও প্রণালির দুই পাড়ে তৈরি হওয়া মানবিক সংকট অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।

চরম গরম, সীমিত সুযোগ-সুবিধা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও মারকাজি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো এখনই ইয়েমেনে ফিরতে চান না। কাসিম আবসির স্ত্রী আয়েশা আব্দুলকাদির বলেন, ‘দেশে শান্তি ফিরলে আমরা ফিরব। আমাদের শুধু শান্তি প্রয়োজন। আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য, তারপর খাদ্য, পানি ও শিক্ষার জন্য।’

ইয়েমেনে সংঘাত ও বোমা হামলা পুরোপুরি থামার আগ পর্যন্ত জিবুতির বালুকাময় প্রান্তরে প্লাস্টিকের ত্রিপল ও তাঁবুর নিচের জীবনই ইব্রাহিম ইসাসহ বহু বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনির কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category