বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৯ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
ভোজ্যতেলের দাম লিটারে ৪ টাকা বাড়ল ভারি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ৩ মাস সহায়তা দেবে সরকার :প্রধানমন্ত্রী পটুয়াখালীর এমপিওভুক্ত কলেজে চরম অনিয়ম: ৪০ শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত মাত্র ২, নেই শিক্ষার্থী বন্যার পূর্বাভাস, নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু পুলিশে নতুন করে ১৪ হাজার ৫০০ পদ সৃষ্টি হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোয়ালন্দে ‘পার্টনার’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: স্বজনপ্রীতিতে বঞ্চিত কৃষক, তদন্তের দাবি ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগে মধুপুর ছকিরননেছা সঃ প্রাঃ বিদ্যালয়ে তদন্ত, ভিডিও ভাইরাল, সত্যতা মিলেছে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার ইরানের : রাশিয়া মানবিক রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে সবাই ন্যায়বিচার পাবেন: প্রধানমন্ত্রী
চট্টগ্রামের প্রশাসনিক সংকট সমাধানে নগর সরকার

চট্টগ্রামের প্রশাসনিক সংকট সমাধানে নগর সরকার

গত রবিবার, ২৫শে জানুয়ারি নির্বাচনী জনসভায় চট্টগ্রামকে একটি কার্যকর বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার বার্তা দিয়ে গেছেন তারেক রহমান। এতে জনসাধারণের মনে প্রশ্ন জেগেছে, প্রাচীন আমল থেকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া চট্টগ্রামকে কেন নতুন করে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার প্রয়োজন হলো।

অথচ, দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী এই নগরী বর্তমানে যে একটি জটিল প্রশাসনিক স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এই কঠিন বাস্তবতা আমরা অনেকেই জানি না। একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমার উপলব্ধি হয়েছে, এই সমস্যা যতটা না অর্থনৈতিক, তার চাইতে বেশি সমন্বয়হীনতার।

বর্তমানে চট্টগ্রামের নগর ব্যবস্থাপনায় প্রায় ২৬টি সংস্থা যুক্ত থাকলেও এদের মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় প্রক্রিয়া নেই। এর সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে আমরা প্রায়ই দেখি—একটি সড়ক সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের অল্পকাল পরেই ভূগর্ভস্থ সেবা সংযোগের দোহাই দিয়ে তা পুনরায় খনন করা হয়। প্রকৌশলগত ভাষায় একে বলা হয় ল্যাক অফ কমন ইউটিলিটি ডাকটিং। শুধুমাত্র সমন্বয়ের অভাবে অধিকাংশ সড়ক নির্মাণকালে ওয়াসা বা কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্মিত অবকাঠামোটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সমন্বয়হীনতার ফলে কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয় না, বরং সড়কের আয়ুষ্কাল বা ডিজাইন লাইফ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।

জলাবদ্ধতার মতো দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ক্ষেত্রেও কারিগরি সমাধানের চেয়ে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতাই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নাধীন থাকলেও এর কারিগরি সাফল্য নির্ভর করছে একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত নালা ও খাল পরিষ্কারের ওপর। অথচ, এখানেও সংকট কম নয়। প্রকল্পের অবকাঠামো যেখানে নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, এর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আবার সিটি কর্পোরেশনের ঘাড়ে। এই দ্বৈত শাসন বা ওভারল্যাপ অফ জুরিসডিকশন এর কারণে কোনো পক্ষকেই পূর্ণ দায়বদ্ধ করা যাচ্ছে না। ফলস্বরূপ, বিশাল বিনিয়োগ সত্ত্বেও সাধারণ নাগরিকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিদিন যে বিশাল পরিমাণ কন্টেইনার হ্যান্ডল করে, তার জন্য সিটি মেয়রের আওতাধীন একটি সমন্বিত ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা আইটিএমএস প্রয়োজন ছিল। অথচ নগরের সড়কগুলো চসিকের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ বিভাগ, আর পণ্যবাহী যানের প্রবেশ নির্ধারিত হয় বন্দর কর্তৃপক্ষের চাহিদাপত্রে। এই তিনটি চাকার গতি যখন তিন দিকে থাকে, তখন পুরো শহরটি একটি স্থবির ট্রাফিক জ্যামের কবলে পড়ে। এক্ষেত্রে, যেহেতু চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একটি সরাসরি নির্বাচিত ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান, তাই একে কেন্দ্র করেই একটি নগর সরকার এর রূপরেখা প্রণয়ন করা জরুরি।

সবচাইতে বেশি যৌক্তিক। সিঙ্গাপুরের Urban Redevelopment Authority (URA) বা টোকিও মেট্রোপলিটন গভর্ন্যান্সের মতো সমন্বিত শাসন ব্যবস্থা বা নগর সরকার একটি Unified Command Center এক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হতে পারে। এই মডেলের আওতায় সিটি মেয়রের নেতৃত্বে শহরের সব সেবাদানকারী সংস্থা তাদের কর্মপরিকল্পনা সমন্বয় করার সুযোগ পায় এবং আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদার প্রতিফলন ঘটাতে পারে।

এক্ষেত্রে, একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার থেকে শহরের সিসিটিভি, ট্রাফিক লাইট এবং ড্রেনেজ সেন্সরগুলো পর্যবেক্ষণ করা হলে যেমন নাগরিক ভোগান্তি অনেকাংশে যেমন লাঘব হবে, তেমনি রিসোর্স পোলিং এর মতো আন্তর্জাতিক মানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের শত কোটি টাকাও সঞ্চয় করা সম্ভব। চট্টগ্রাম যখন বে-টার্মিনাল বা জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো মেগাপ্রকল্পের মাধ্যমে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে নিজেকে যুক্ত করতে যাচ্ছে, তখন এই পুরনো ও বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো আসছে দিনগুলোতে সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

এতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কেবল কয়েকটি ফ্লাইওভার বা প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বা ইনস্টিটিউশনাল রিফরমেশনের দাবি রাখে। এক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনকে অভিভাবকত্বের আসনে বসিয়ে একটি নগর সরকার বা মেট্রোপলিটন অথরিটি গঠন করা এখন বিলাসিতা নয়, বরং দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি কারিগরি বাধ্যবাধকতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে এই সাহসী পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত আছি?

আরমান আলী চৌধুরী গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

সময়ের ধারা সংবাদটি শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © somoyerdhara.com
Desing by Raytahost.com