আমরা যদি আমাদের জীবনযাত্রায় অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তা হলে অনেক রোগ থেকেই রক্ষা পাব। জীবন বাঁচাতে খাদ্যের প্রয়োজন। তবে এমন অনেক খাবার আছে, যা জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে জীবন ক্রমে কেড়ে নিতে পারে। অনেক সময় এ অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো না জেনেই খেয়ে থাকি। অনেক সময় এ অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো এত আকর্ষণীয় ও মুখরোচক থাকে যে, লোভ সামলানো দায়।
অস্বাস্থ্যকর খাবার : অস্বাস্থ্যকর খাবারতালিকায় প্রথমেই আসে তেলে ভাজা খাবারের কথা। তেলে ভাজা খাবারের মধ্যে আছে- চিকেন ফ্রাই, ফ্রেন্স ফ্রাই, ফুচকা, সিঙাড়া, পুরি ইত্যাদি, যা মুখরোচক ও আকর্ষণীয়। ছোট-বড় সবার কছেই পছন্দের খাবার এগুলো। কিন্তু এগুলো শরীরের নানা ধরনের ক্ষতি করে, যা আমরা পরে বুঝতে পারি।
সাবধানতা : এসব তেলে ভাজা খাবারে থাকে ট্রান্সফেট, যা শরীরের ফ্রি রেডিকেলসের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে দেহকোষের ক্ষতি করে। এছাড়া রক্তের খারাপ চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করে। যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, গ্যাসট্রিক ইত্যাদি। তেলে ভাজা এসব খাবার হয় উচ্চ ক্যালরিযুক্ত। ফলে প্রতিদিন খেতে থাকলে দেহে চর্বি জমে ওজন বাড়াসহ নানা ধরনের রোগ, যেমন- টাইপ২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার, এমনকি স্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারে। ইদানীং প্রায় সব স্কুল- কলেজগামী ছেলেমেয়েরা ফাস্টফুড ও জাংকফুডে আসক্ত। ফলে ছেলেমেয়েদের রক্তে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি বেড়ে যাচ্ছে। পছন্দের খাবার কোমল পানীয়। ছোট-বড় সবার খুব পছন্দের খাবার। যে কোনো দাওয়াতে কোমল পানীয় থাকে। এ ছাড়া গরমে শান্তির ছোঁয়া পেতে কোমল পানীয়ই একমাত্র ভরসা। এ কোমল পানীয় আমাদের সাময়িক তৃপ্তি আনে বটে কিন্তু শরীরের ক্ষতি করে। এর মধ্যে থাকে চিনি, ঘন চিনি, আর্টিফিশিয়াল সুগার বা কৃত্রিম চিনি, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
ওজন বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি ছাড়াও রুচি নষ্ট করে দেয়। ইদানীং অনেক খাবারেই টেস্টিং সল্ট (মনো সোডিয়াম গ্লুটামেট) ব্যবহার করা হয়, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। যেমন- চিপস, সুপ, ফ্রাইড রাইস, ফ্রাইড চিকেন, নুডলস ইত্যাদি। টেস্টিং সল্ট দেওয়া খাবার শিশুদের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর। শিশুদের মেজাজী, অমনোযোগী, মারমুখো করে তোলে। এছাড়া গর্ভবতী মায়ের গর্ভের সন্তানের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ে। ফলে মানসিক প্রতিববন্ধী শিশু জন্মলাভ করতে পারে।
রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায়, অ্যালোভেরার জুস, গাছের শিকড়ের জুস, আখের রস, লেবুপানি ইত্যাদি। খুব স্বাস্থ্য সচেতন যারা, তারা ভোরবেলা জগিং করে বাড়ি ফেরার পথে এক গ্লাস পান করে নেন। কেউ আবার ক্লান্তি দূর করতে অথবা কেউ কেউ আবার খুবই স্বাস্থ্যকর পানীয় ভেবে পান করেন। এসব পানীয় স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। তবে তারা এতে যে পানি ব্যবহার করেন, তা জীবাণুমুক্ত পানি কিনা, সন্দেহ। একই গ্লাস ভালো করে না ধুয়ে অন্য আরেকজনকে সেই গ্লাসে পরিবেশন করেন। এসব পানীয় খেলে ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস, টাইফয়েড ইত্যাদি রোগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। শুঁটকি মাছ অনেকেরই প্রিয় একটি খাবার। শুঁটকি মাছে যেন পোকামাকড় না ধরে, সেই জন্য এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় নিধনকারী ওষুধ দেওয়া হয়, যা দেহে প্রবেশ করে নানা ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করতে পারে। এমনকি নিয়মিতভাবে এ বিষাক্ত পদার্থ দেহে প্রবেশ করলে কিডনি অকেজো হয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসা : এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার যদি আমরা না খাই এবং আমাদের দৈনিক খাবারতালিকা থেকে বাদ দিই, তা হলে আমরা অনেকগুলো রোগ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারব। তবে রোগ হলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।
লেখক : ক্লিনিক্যাল ডায়টিশিয়ান ও কনসালট্যান্ট
ইমপালস হসপিটাল, তেজগাঁও, ঢাকা