বৃদ্ধ দম্পতির বসবাসের একমাত্র ঘরটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ। ভাঙা টিন ও প্লাস্টিক দিয়ে কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে রাখা হয়েছে। সামান্য ঝড়-বৃষ্টি হলেই ছাউনি দিয়ে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে, বিছানাও ভিজে যায়। ঘরে নেই কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ। খোলা আকাশের একটু আলোই তাদের সম্বল। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই রান্না ও খাবার শেষ করে অন্ধকার ঘরে আশ্রয় নিতে হয় তাদের। মৃত্যুর আগে নতুন ঘরে থাকতে চান তিনি।
গৃহকর্তা কিরণ হাজং বার্ধক্যজনিত কারণে প্রায় চোখে দেখতে পান না। চলাফেরা করতেও অন্যের সহায়তা প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে স্ত্রী পিকলা হাজংও বয়সজনিত কারণে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তাদের কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। দু‘বেলা দু‘মুঠো খাবারের জন্য ভরসা করতে হয় অন্যের উপর। কেউ খাবার দিলে সেদিন দুবেলা খেতে পারেন। কেউ খাবার না দিলে না খেয়েই দিন কাটাতে হয়।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ২নং দুর্গাপুর ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামের বাসিন্দা কিরণ হাজং (৮৩) ও তার স্ত্রী পিকলা হাজং (৭৮) চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই বৃদ্ধ দম্পতির সংসারে সদস্য মাত্র দু’জন। বার্ধক্য, দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করলেও তাদের খোঁজ নেওয়ার মতো এখন আর কেউ নেই। মহান সৃষ্টিকর্তাই তাদের একমাত্র ভরসা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ছেলে সিলেটে বসবাস করলেও দীর্ঘদিন ধরে মা-বাবার কোনো খোঁজখবর নেন না। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং তারাও আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারছেন না।
বৃদ্ধ কিরণ হাজং বলেন, আগে মানুষের জমিতে ধান কাটতাম, শুঁটকি মাছ ধরতাম, দিনমজুরি করে কোনো রকমে সংসার চালাতাম। এখন বয়স হয়েছে, শরীরে আর শক্তি নেই। চোখেও ঠিকমতো দেখি না। কোনো কাজ করতে পারি না। তাই খুব কষ্টে দিন কাটছে। বয়স্ক ভাতা পেলে অন্তত ভালোভাবে খেতে পারতাম। গত তিন-চার বছর ধরে বয়স্ক ভাতার জন্য চেষ্টা করছি। প্রায় চার বছর আগে আবেদনও করেছি। ভেবেছিলাম হয়তো পাব, কিন্তু আজও সরকারের পক্ষ থেকে পাইনি বয়স্ক ভাতা।
আমার এক ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। তারা যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ইচ্ছা হলে কখনো কিছু দেয়, আবার অনেক সময় দেয় না। তবে আমার মেয়েরা মাঝে মধ্যে চাল-ডাল দিয়ে কিছুটা সহযোগিতা করে। স্থানীয়রা প্রায়ই আমাদের জন্য খাবার পাঠায়, সেগুলো দিয়েই কোনোভাবে খেয়ে বেঁচে আছি। আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা, থাকার মতো যদি নিরাপদ ঘর পেতাম, তাহলে জীবনের শেষ সময়টা অন্তত একটু স্বস্তিতে বাঁচতে পারতাম।
পিকলা হাজং বলেন, আগে আমরা মানুষের জমিতে কাজ করতাম। ধান কাটতাম, নালায় মাছ ধরতাম, দিনমজুরি করে কোনোভাবে সংসার চালাতাম। কিন্তু এখন আর সেই শক্তি নেই। বয়সের ভারে আমরা দু’জনই অচল হয়ে গেছি। গ্রামের মানুষ ধান কাটার মৌসুমে মৌসুমে যে ধান দিয়ে সাহায্য করে, সেটুকু দিয়েই কোনোমতে আমাদের জীবন চলছে। কতোদিন ধরে মাছ-মাংশ খাইনা।
আজ কি দিয়ে খেয়েছেন জানতে চাইলে পিকলা হাজং বলেন, আজ দুপুরে আমরা দু’জনে মিলে একটি মাত্র ডিম ভাগ করে খেয়েছি। আলাদা করে একজনের জন্য একটি ডিম রান্না করার কোন উপায় নাই। তাই একটা ডিম ভাগ করেই খেতে হয়েছে। রাতে মুড়ি না হয় জল-ভাত খেয়ে ঘুমাবো।
সরকারের কাছে আমাদের একটাই আবেদন, আমাদের জন্য অন্তত: একটা ঘর করে দেওয়া হোক। পাশাপাশি নিয়মিত বয়স্ক ভাতা তাহলে জীবনের শেষ সময়টা অন্তত একটু স্বস্তিতে কাটাতে পারতাম।
প্রতিবেশী জিতেন্দ্র হাজং বলেন, কিরণ হাজং ও পিকলা হাজং আমার পাশের বাড়িতে বসবাস করেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা এই গ্রামেই বসবাস করছেন। তাদের ছেলে-মেয়ে থাকলেও সবাই দরিদ্র হওয়ায় বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব ঠিকমতো নিতে পারছেন না। আগে দুজনেই কাজ করতে পারতে কিন্ত এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন। চোখেও খুব কম দেখেন। ফলে আর কাজ করতে পারেন না, ধানের শীষ কুড়াতেও যেতে পারেন না, বর্তমানে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
হাজং নেতা দোলন হাজং বলেন, অনেকবার বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা এসে তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। কিরণ হাজং বয়স্ক ভাতার জন্য আবেদনও করেছিলেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত তিনি কোনো বয়স্ক ভাতা পাননি। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাই, এই অসহায় বৃদ্ধ দম্পতির জন্য দ্রুত বয়স্ক ভাতা, একটি নিরাপদ বসতঘর ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার ব্যবস্থা করা হউক।
দুর্গাপুর ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রিতা নকরেক বলেন, “সম্প্রতি শ্যামনগর গ্রামে গিয়ে কিরণ হাজং ও পিকলা হাজংয়ের বাড়িতে তাদের খোঁজখবর নিতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, বার্ধক্যের কারণে তারা আর কোনো ধরনের কাজ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা রাখেন না। তাদের বাড়িতে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই তারা অন্ধকার ঘরে রাত কাটাতে বাধ্য হন। বৃদ্ধ দম্পতির বসবাসের ঘরটিও অত্যন্ত জরাজীর্ণ। ঘরের ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতরে পড়ে, বিছানা ভিজে যায়। বর্তমানে তারা অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আমি দ্রুক বয়স্ক ভাতার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবো সেইসাথে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোকেও তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।
জানা গেছে, কিরণ হাজং সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রায় ১৫ বছর আগেই বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য হলেও আজ পর্যন্ত সেই সুবিধা পাননি। প্রায় চার বছর আগে তিনি বয়স্ক ভাতার জন্য আবেদন করলেও এখনও তা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে অভিযোগ করেন কিরণ হাজং।
এলাকাবাসীর দাবি, কিরণ হাজং ও পিকলা হাজংয়ের জন্য অবিলম্বে বয়স্ক ভাতা, একটি নিরাপদ বসতঘর, বিদ্যুৎ সংযোগ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হউক। তাদের মতে, প্রকৃত অসহায় মানুষ যদি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, তবে সেই কর্মসূচির উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবান মানুষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই অসহায় বৃদ্ধ দম্পতি অন্তত তাঁদের ন্যূনতম মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বস্তির সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন।