এ এম লিটন, গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি : পহেলা বৈশাখের ছুটির দিনে গাজীপুরের টঙ্গীতে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ঘিরে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম সরকারের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা মানবপ্রাচীর ও নজিরবিহীন জনসমাগম দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অনলাইন গণমাধ্যম, টেলিভিশন চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের উচ্চ মহলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। গতকাল সংবাদপত্র বন্ধ থাকায় ছাপা না হলেও আগামীকাল জাতীয় দৈনিকগুলোতে এটি প্রধান সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকালে টাঙ্গাইলগামী পথে টঙ্গীর বিআরটি প্রকল্পের স্টেশন রোড এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর পৌঁছালে নূরুল ইসলাম সরকারের মুক্তির দাবিতে বিপুল সংখ্যক জনতা সড়কের দুই পাশে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দিতে দিতে গাড়িবহরের গতি কমিয়ে সামনে মানবপ্রাচীর তৈরি করে নূরুল ইসলাম সরকারের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।
এ সময় উপস্থিত জনতার ঢল ও স্লোগানে পুরো এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দী এই মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিকের মুক্তিকে ‘ন্যায়বিচারের প্রশ্ন’ হিসেবে তুলে ধরেন। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, “নূরুল ইসলাম সরকার দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে অন্যায়ভাবে কারাবন্দী। আমরা তার অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি চাই।”
ঘটনাস্থলে নূরুল ইসলাম সরকারের ছেলে শাহনূর ইসলাম রনিসহ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আবেগঘন পরিবেশে কণ্ঠ মিলিয়ে তার মুক্তির দাবিতে কড়জোড়ে আকুতি জানান। তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের বেদনা, প্রতীক্ষার ক্লান্তি এবং ন্যায়বিচারের আকুল আহ্বান।
এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির ভেতর থেকে তিনি দুই হাত তুলে শান্ত থাকার এবং সড়কের মাঝে কিছুটা ফাঁকা করে দেওয়ার ইঙ্গিত দেন, যাতে গাড়িবহরটি এগিয়ে যেতে পারে। তবে সেই মুহূর্তেও জনতার কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে একটিই দাবি – নূরুল ইসলাম সরকারের মুক্তি।
এদিকে, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একটি মহল এই ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে কিছু পক্ষ বিষয়টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সক্রিয় রয়েছে। যারা নূরুল ইসলাম সরকারের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আলোচিত মামলায় ফাঁসিয়েছে, তারা আবারো পদ্মার অন্তরালে তৎপর বলে অভিযোগ উঠেছে। নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নূরুল ইসলাম সরকার একটি ‘বিতর্কিত মামলার’ কারণে দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দী রয়েছেন, যা গাজীপুরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও বেদনার জন্ম দিয়েছে। তারা দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং তার মুক্তির মাধ্যমেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ২০০৪ সালে টঙ্গীতে জাতীয় শ্রমীক লীগ নেতা ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। তাদের মতে, তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকারের সময় এই হত্যাকাণ্ডের দায় সরকার ও বিশেষ করে বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছিলো আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে তারা দাবি করেন, পরবর্তী সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নূরুল ইসলাম সরকারকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি এখনো বিচারাধীন থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের ওপরই নির্ভর করছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে ন্যায়বিচার ও একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ৭ মে টঙ্গী নোয়াগাঁও স্কুল মাঠে স্বেচ্ছাসেবকলীগের সম্মেলনে দলীয় সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন আহসান উল্লাহ মাস্টার। এ ঘটনায় আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছোট ভাই মতিউর রহমান মতি বাদী হয়ে ১৭ জনের নামে টঙ্গী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় নূরুল ইসলাম সরকারকে সরাসরি আসামী করা না হলেও এজাহারের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়, ‘বর্ণিত আসামীরা বিএনপি নেতা নূরুল ইসলাম সরকারের লালিত পালিত’। এদিকে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল বিচারিক আদালত এই মামলায় বিএনপি নেতা নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।
পরে হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স শেষে ২০১৬ সালের ১৫ জুন ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং সাতজনের মৃত্যুদণ্ড বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। রায়ে ১১ জনকে মামলা থেকে খালাস দেন উচ্চ আদালত। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন আসামিরা। যা বর্তমানে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে। ঘটনাটি ইতোমধ্যে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার প্রভাব দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
Leave a Reply